ওয়েলসের রাজধানীতে ইংল্যান্ড ছাড়া যুক্তরাজ্যের বাকি তিনটি রাজ্যের রাজনৈতিক নেতাদের এই বিরল বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যার কয়েক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড গঠনের প্রতি নিজের সমর্থনের কথা জানিয়ে এই বিতর্কে ঘি ঢালেন। উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধি মিচেল ও’নিল তাদের ‘যৌথ সমঝতা স্মারক’ ঘোষণার সময় অন্যান্য দলের নেতাদের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রমাণ করে যে, ঐক্যের বিষয়ে আলোচনাটি বর্তমানে ‘যথেষ্ট সক্রিয়’ রয়েছে।
এই তিনটি রাজনৈতিক দলই—স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি), ওয়েলসের প্লেইড কামরু এবং আইরিশ ঐক্যের সমর্থক সিন ফেইন—যুক্তরাজ্য থেকে আলাদা হতে চায়। তাদের সদ্য স্বাক্ষরিত চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আমাদের জাতিগুলোর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। কোনো ওয়েস্টমিনস্টার সরকারের (যুক্তরাজ্য সরকার) অধিকার নেই গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করার কিংবা আমাদের জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করবে—এমন নীতিকে ক্ষুণ্ন করার।’
এসএনপি নেতা জন সুইনি, ওয়েলসের প্লেইড কামরুর নেতা রুন আপ ইওরওয়ার্থ এবং আইরিশ ঐক্যের সমর্থক সিন ফেইনের সভাপতি মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড ও সহ-সভাপতি মিচেল ও’নিল নিজ নিজ সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং দলীয় নেতা হিসেবে এই বৈঠকে অংশ নেন।
মিচেল ও’নিল উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং ইওরওয়ার্থ ও সুইনি নিজ নিজ জাতির ফার্স্ট মিনিস্টার পদে রয়েছেন। চুক্তির ঘোষণার সময় সুইনি বলেন, তিনটি দলই আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতির ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে ঐক্যবদ্ধ।
স্বাধীনতা
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশেরই ফার্স্ট মিনিস্টাররা ‘যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ বলে চুক্তিতে উল্লেখ করা হয় এবং এতে আরও যোগ করা হয় – ‘আমাদের জাতিগুলোর ভবিষ্যৎ লুকিয়ে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে।’
১৯৯৯ সালে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো স্কটিশ ও ওয়েলশ সংসদে স্বাধীনতাপন্থি দলগুলো বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্যদিকে ২০২২ সাল থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডের অ্যাসেম্বলিতে সিন ফেইন সবচেয়ে বড় দল হিসেবে রয়েছে।
ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড নিয়ে গঠিত যুক্তরাজ্য তার আঞ্চলিক সংসদগুলোর কাছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে মূল ক্ষমতা অর্পিত করেছে। এর সাথে কিছুটা কর সংগ্রহের ক্ষমতাও তাদের রয়েছে।
গত জুলাইয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম এই তিন জাতির ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে তুলনামূলকভাবে খুব কম কথাই বলেছেন। ১০ ডাউনিং স্ট্রিট স্ট্রাকচার অফিসের এক মুখপাত্র সোমবার জানান, প্রধানমন্ত্রী ঐক্যের নীতিতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। এটি মূলত সেই সাংবিধানিক চুক্তিকে নির্দেশ করে যা উত্তর আয়ারল্যান্ডকে যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবে ধরে রেখেছে।
যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এই তিনটি দল ঐক্যবদ্ধ হলেও, এটি কীভাবে এবং কখন কার্যকর হবে সে বিষয়ে তাদের বিভিন্ন অবস্থান রয়েছে। এসএনপি দ্বিতীয়বার স্বাধীনতার গণভোট চায়; ২০১৪ সালের আগের এক গণভোটে স্কটল্যান্ড খুব অল্প ব্যবধানে ব্রিটেনের অংশ থাকার পক্ষে রায় দিয়েছিল। তবে যুক্তরাজ্যের পরবর্তী সরকারগুলো অদূর ভবিষ্যতে নতুন গণভোটের সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছে।
আধা-সামরিক বাহিনী আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির (আইআরএ) সাবেক রাজনৈতিক শাখা সিন ফেইন চায় যুক্তরাজ্যের অধীনস্থ ভূখণ্ড উত্তর আয়ারল্যান্ডকে আয়ারল্যান্ডের সাথে পুনরেকত্রীকরণের জন্য একটি ভোট বা গণভোট অনুষ্ঠিত হোক।
অন্যদিকে, প্লেইড কামরু দীর্ঘমেয়াদে ওয়েলসের স্বাধীনতা চায়, তবে ইওরওয়ার্থ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গণভোটের ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন।
গুড ফ্রাইডে চুক্তি
গত মাসে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম বলেছিলেন আইরিশ ঐক্যের বিষয়ে গণভোটের বিষয়টি ‘টেবিলের বাইরে রাখা হয়েছে।’ সে সময় সিন ফেইনের কাছ থেকে তিনি বেশ কড়া প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন।
১৯৯৮ সালের ঐতিহাসিক ‘গুড ফ্রাইডে শান্তি চুক্তি’—যা ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে তিন দশকের সংঘাতের অবসান ঘটিয়েছিল, তাতে বলা হয়েছে যে, যদি ব্রিটিশ সরকারের উত্তর আয়ারল্যান্ড বিষয়ক মন্ত্রী বিশ্বাস করেন যে অধিকাংশ জনগণ রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ডের সাথে যোগ দেওয়ার পক্ষে রায় দেবে, তবেই একটি গণভোট আহ্বান করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সিন ফেইন নেতা ম্যাকডোনাল্ড মন্তব্য করেন যে, চুক্তির কোনো বিধান বাদ দেওয়ার কোনো এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের নেই। এর ফলে বার্নহাম গত সপ্তাহে পার্লামেন্টে তার বক্তব্য সংশোধন করতে বাধ্য হন।
জাতীয়তাবাদী নেতাদের এই বৈঠক এবং ট্রাম্পের মন্তব্য বেলফাস্টের সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ৬১ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত চাকুরিজীবী রে ডেনিসন এএফপি-কে বলেন, ‘আয়ারল্যান্ড যদি একটি একক দেশ হতো এবং আমরা যদি পুনরায় ইইউ-তে ফিরতে পারতাম তবে অনেক ভালো হতো।’
তবে ৬৪ বছর বয়সী পরিবেশকর্মী জিম বয়েল জানান, জাতীয়তাবাদী নেতাদের এই বৈঠক তাঁকে শঙ্কিত করেছে। তিনি বলেন, ‘বহু বছর আগে হয়তো আমি যুক্তরাজ্য ভেঙে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, কিন্তু এখন… আমি অনিশ্চিত বা অপ্রত্যাশীত কিছু চাই না।’
স্কটল্যান্ড প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, যদি কোনো স্পষ্ট সর্বসম্মতি থাকে তবে সেখানে আরেকটি ভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে, যদিও পরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, গণভোটের বিষয়টি ‘সীমার বাইরেই’ রয়েছে।


