পেয়ার ফলের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি উচ্চ ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল। অনেকেই মনে করেন, ভিটামিন সি’র জন্য শুধু কমলা বা লেবু সেরা উৎস। তবে প্রকৃত অর্থে পেয়ারা হচ্ছে ভিটামিন সির জন্য সেরা একটি ফল। পাশাপাশি খাদ্যআঁশ, পটাশিয়াম এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে। বিশেষ করে পেয়ারা যখন গোটা ফল হিসেবে খাওয়া হয়, তখন এর ফাইবার ও ফাইটোকেমিক্যালের কারণে এটি ভারসাম্যপূর্ণ নাশতা হিসেবেও রাখা যায়।
পেয়ারার পুষ্টি উপাদান ও উপকারিতা সম্পর্কে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন পুষ্টিবিদ ফৌজিয়া আহমেদ অনু। তিনি বলেন, পেয়ারা খাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি―কোনো একটি ফলকে সুপারফুড বা কোনো রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। সুস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্যতালিকা, যেখানে বিভিন্ন ধরনের ফল, শাকসবজি, গোটা শস্য, প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার এবং পর্যাপ্ত পানি থাকবে। পেয়ারা সেই বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকার একটি চমৎকার অংশ হতে পারে।
পেয়ারা কী কী পুষ্টি দেয়:
পেয়ারার পুষ্টিগুণ মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের কারণে উল্লেখযোগ্য। যেমন―
- ভিটামিন সি: পেয়ারা ভিটামিন সি’র অন্যতম উৎস। ভিটামিন সি একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা স্বাভাবিক ইমিউন ফাংশন বজায় রাখতে সাহায্য করে। কোলাজেন সিন্থেসিসে ভূমিকা রাখে। ত্বক, রক্তনালি, হাড় ও সংযোগ টিস্যুর স্বাভাবিক গঠনে প্রয়োজনীয়। উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রণ শোষণ বাড়াতে সাহায্য করে। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস মোকাবিলায় অ্যান্টিক্সিডেন্ট হিসেবেও কাজ করে পেয়ারা।
- খাদ্যআঁশ: পেয়ারায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্যআঁশ রয়েছে। যা অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়ক হতে পারে। দীর্ঘসময় পেট ভরা অনুভূতি দিতে সাহায্য করে। খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজ বৃদ্ধির গতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে হঠাৎ করে বেশি আঁশ গ্রহণ করা হলে কারও কারও পেটব্যথার মতো সমস্যা হতে পারে। এ জন্য আঁশ গ্রহণের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ানো যেতে পারে এবং পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
- পটাশিয়াম: পেয়ারা পটাশিয়ামের জন্যও একটি সেরা উৎস। পটাশিয়াম তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে, স্নায়ুর ফাংশন, পেশী সংকোচন ও রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- ফোলেট: পেয়ারায় ফোলেট উপাদান রয়েছে। যা ডিএনএ সংশ্লেষণ, কোষ বিভাজন, লোহিত রক্তকণিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের জন্য পর্যাপ্ত ফোলেট গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে অন্তঃসত্ত্বার ক্ষেত্রে পেয়ারা খেয়ে ফোলেটের প্রয়োজন পূরণ করার চেষ্টা করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ফোলিক এসিড সাপ্লিমেনটেশন ও সুষম খাদ্য গুরুত্বপূর্ণ।
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফাইটোকেমিক্যাল: পেয়ারায় ভিটামিন সি’র পাশাপাশি বিভিন্ন ক্যারোটিনয়েড, পলিফেনল এবং অন্যান্য ফাইটোকেমিক্যাল পাওয়া যায়। এসব বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকা মানেই কোনো নির্দিষ্ট রোগ-প্রতিরোধ বা চিকিৎসা করবে, এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে করা ঠিক নয়।
- পেয়ারা খাওয়ার সম্ভাব্য উপকারিতা:
রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতার স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়ক: ভিটামিন সি রোগ-প্রতিরোধের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এ জন্য ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল হিসেবে পেয়ারা দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। - হৃদ-স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী: পেয়ারার ফাইবার, পটাশিয়াম বিভিন্ন ফাইটোকেমিক্যাল একটি হৃৎপিণ্ড-বান্ধব খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে শুধু পেয়ারা খেলেই কোলেস্টেরল বা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ হবে―এমন ধারণা ঠিক নয়। সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা, ওজন এবং অন্যান্য জীবনযাপনের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ।
আয়রন শোষণে সহায়ক: ভিটামিন সি নন-হিম আয়রনের শোষণ বাড়াতে সাহায্য করে। তাই ডাল, শাকসবজি বা অন্যান্য শস্যভিত্তিক আয়রন উৎসের সঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ পেয়ারা খাওয়া ভালো কৌশল হতে পারে।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক:
পেয়ারা তুলনামূলকভাবে কম ক্যালোরি এবং ফাইবারযুক্ত হল। এ জন্য বিস্কুট, মিষ্টি বা প্রক্রিয়াজাত নাশতার পরিবর্তে একটি গোটা পেয়ারা খাওয়া হতে পারে একটি দুর্দান্ত নাশতার অংশ। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শস্য দানা খাওয়া ভালো, কিন্তু অতিরিক্ত চিনি দিয়ে জুস তৈরি করা ঠিক নয়।


