চাকাবিহীন বা স্থায়ী ল্যান্ডিং গিয়ারযুক্ত হালকা যুদ্ধবিমান নিয়ে আত্মঘাতী পাইলটরা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবহর, বিমানবাহী রণতরী ও সামরিক স্থাপনায় আছড়ে পড়তেন।
এই প্রতিবেদনকে কামিকাজে কৌশলের জন্ম, প্রযুক্তি, রণকৌশল ও আশপাশের সমুদ্রে সংঘটিত ভয়াবহ হামলা, ইউএসএস ডরসি ও ইউএসএস বাঙ্কার হিলের অভিজ্ঞতা, পাইলটদের মানসিকতা, মিত্রবাহিনীর প্রতিরোধ, এবং যুদ্ধোত্তর ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের আলোকে পুরো ঘটনাপ্রবাহকে বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো হয়েছে।
আত্মঘাতী বিমান হামলার ধারণা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধে জাপান যখন আকাশ ও সমুদ্রে আধিপত্য হারাতে শুরু করে, তখনই জন্ম নেয় আত্মঘাতী িবমান হামলার মতো এক দুর্ধর্ষ ধারণা। ১৯৪৪ সালের শেষ দিকে ফিলিপাইনে প্রথম বড় আকারে এই কৌশল প্রয়োগ হয়। প্রচলিত বোমাবর্ষণ বা ডগফাইটে সাফল্য কমে যাওয়ায় জাপানি সামরিক নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেয় যুদ্ধবিমানকেই বানানো হবে অস্ত্র, আর পাইলট হবেন আত্মোৎসর্গকারী যোদ্ধা। লক্ষ্য একটাই- শত্রুপক্ষের জাহাজে সরাসরি আঘাত করে সর্বোচ্চ ক্ষতি সাধন।
এই আত্মঘাতী বিমানের বড় অংশ ছিল পুরোনো বা দ্বিতীয় সারির উড়োজাহাজ। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোতে স্থায়ী চাকা বা স্প্যাটেড আন্ডারকারেজ থাকত, যা দেখতে ছিল ভারী ও ধীরগতির। তবুও কামিকাজে অভিযানে এগুলো কার্যকর হয়ে ওঠে, কারণ পাইলটদের ফেরার কোনো পরিকল্পনাই থাকত না। বিমানের মাঝখানে বসানো হতো বড় আকারের ২৫০ কেজির বোমা, যা আঘাতের মুহূর্তে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটাত।
অনেক কামিকাজে আত্মঘাতী বিমানের চাকা ছিল, তবে কিছু বিশেষ মডেলে তা ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাধারণ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হতো, কিন্তু ওকা নামক রকেট-চালিত আত্মঘাতী বিমানে চাকা থাকতো না। এসব যুদ্ধবিমানগুলোকে বড় ধরনের কার্গো বিমান থেকে ছেড়ে দেয়া হতো এবং যেসব বিমানে চাকা থাকতো কিছু ক্ষেত্রে ওজনের ভার কমানোর জন্য টেকঅফের পর সেগুলো থেকে চাকা খুলে ফেলা হতো।
যেহেতু এসব মিশনের লক্ষ্যই ছিল আত্মহুতি, তাই ফেরার বা ল্যান্ড করার প্রয়োজনীয়তা ছিল না। আর এই বিবেচনায় ডিজাইনে এমন পরিবর্তন আনা হয়েছিল বিমানগুলোতে।
মার্কিন জাহাজে হামলা
১৯৪৫ সালের মার্চ মাসে জাপানের ওকিনাওয়ার উপকূলে মিত্রবাহিনীর নৌবহর এই হামলার সবচেয়ে তীব্র অভিজ্ঞতা লাভ করে। ইউএসএস ডরসি (ডিএমএস-১), একটি পুরোনো উইকস-ক্লাস ডেস্ট্রয়ার-মাইনসুইপার ২৭ মার্চ ভোরে কামিকাজের আক্রমণের মুখে পড়ে। জাহাজটি তখন কেরামা রেট্টো দ্বীপপুঞ্জের কাছে মাইন পরিষ্কার অভিযানে নিয়োজিত ছিল। শত্রু বিমানের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর সাধারণ সতর্কতা জারি হলেও রক্ষা হয়নি। মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ থেকে নেমে আসে আত্মঘাতী হামলা।
ডরসির নাবিকেরা প্রথমে দূরে অন্য জাহাজে আক্রমণ হতে দেখেন। এরপর তিনটি শত্রু বিমান তাদের দিকে এগিয়ে আসে। দুইটি পাশ কাটিয়ে গেলেও তৃতীয়টি পেছন দিক থেকে ঘুরে এসে আত্মঘাতী ডাইভ দেয়। জাহাজের সব অস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো হয়। ৪০ মিমি বোফর্স ও ২০ মিমি অরলিকন কামান আঘাত হানে বিমানে, আগুন ধরে যায়, এমনকি একটি অংশ ছিটকেও পড়ে। কিন্তু কামিকাজে অভিযানের নির্মম সত্য হলো- এত কিছুর পরও পাইলট তার লক্ষ্য থেকে সরে যাননি।
ভোর ৬টা ২০ মিনিটে সেই জ্বলন্ত বিমানটি ডরসির ডেকের পাশে আছড়ে পড়ে। বিস্ফোরণে জাহাজের গায়ে ফাটল ধরে, চিমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ডেকের বিভিন্ন সরঞ্জাম ধ্বংস হয়। আটজন নাবিক সমুদ্রে ছিটকে পড়েন, এর মধ্যে পাঁচজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও তিনজন নিখোঁজ থাকেন। আরও দুজন গুরুতর আহত হন, যাদের একজন পরে মারা যান। এর পরেও আশ্চর্যজনকভাবে ডরসি দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে আবার কাজে ফিরে যায়।
একই সময়, একই অঞ্চলে আরও কয়েকটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ কামিকাজে হামলার শিকার হয়। ইউএসএস নেভাডা, বিলক্সি, ও’ব্রায়েন, ফরম্যান সবগুলোই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধিকাংশ জাহাজ তাদের আক্রমণকারীকে ‘ভ্যাল’ বলে শনাক্ত করে। ভ্যাল ছিল আইচি ডি৩এ ডাইভ বোম্বারের মিত্রবাহিনী প্রদত্ত কোডনাম, যা পার্ল হারবার থেকে শুরু করে বহু অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছিল।
কিন্তু যুদ্ধোত্তর গবেষণা ও জাপানি নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই দিন আকাশে ভ্যাল ছিল না। বরং আক্রমণ চালিয়েছিল মিতসুবিশি কি-৫১, মিত্রবাহিনীর কোডনাম ‘সোনিয়া’। দেখতে ভ্যাল ও ‘নেট’ ফাইটারের সঙ্গে মিল থাকায় যুদ্ধের উত্তাপে মার্কিন নাবিকেরা ভুল শনাক্ত করেছিলেন। সোনিয়া ছিল জাপানি সেনাবাহিনীর (আইজেএএএফ) একটি দুই আসনের ক্লোজ-সাপোর্ট বিমান, যা পরে ব্যাপকভাবে কামিকাজে ভূমিকায় ব্যবহৃত হয়।
এই সোনিয়া বিমানগুলো পরিচালনা করেছিল বিশেষ কামিকাজে ইউনিট বুকোকু-তাই ও সেকিশিন-তাই। ওকিনাওয়ার নাকা এয়ারফিল্ড থেকে উড্ডয়ন করা ১১টি সোনিয়া ২৭ মার্চ ভোরে মার্কিন নৌবহরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। জাহাজগুলোর রিপোর্টে যতগুলো বিমান দেখা গিয়েছিল, জাপানি রেকর্ডের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়।
এই ভুল শনাক্তকরণের রহস্য আরও স্পষ্ট হয় ২০২০ সালে, যখন ইউএসএস ডরসিতে আছড়ে পড়া বিমানের কিছু ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ করা হয়। প্রপেলারের অংশ, স্পিনার ও একটি ডাটা প্লেট থেকে জানা যায়, বিমানে ছিল ‘হাক্স স্টার্টার’ সংযোগ, যা জাপানি সেনাবাহিনীর বিমানে সাধারণ ছিল। ডাটা প্লেটে নোঙরের বদলে তারকা চিহ্ন থাকাও প্রমাণ করে এটি নৌবাহিনীর ভ্যাল নয়, বরং সেনাবাহিনীর সোনিয়া।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা
ওকিনাওয়ার যুদ্ধকালে সবচেয়ে ভয়াবহ কামিকাজে আঘাতগুলোর একটি আসে ইউএসএস বাঙ্কার হিলের ওপর। ১৯৪৫ সালের ১১ মে সকালে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেই জাপানের কিকুসুই স্পেশাল অ্যাটাক স্কোয়াড্রন মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোকে লক্ষ্য করে। ‘জিকে’ বা জিরো ফাইটার নিয়ে পাইলটরা মেঘের আড়াল ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা এড়িয়ে যায়।
বাঙ্কার হিলে আক্রমণের মুহূর্তে ডেকে অবতরণ করছিল মার্কিন ফাইটারগুলো। রাডার বৃষ্টির কারণে ঠিকমতো কাজ করছিল না। হঠাৎ করেই এক কামিকাজে ডেকে গুলি চালায়, তারপর বোমাসহ আছড়ে পড়ে। অল্প সময়ের ব্যবধানে আরেকটি বিমান একইভাবে আঘাত হানে। ডেকে ছড়িয়ে পড়ে আগুন, বিস্ফোরণে ধ্বংস হয় রেডি রুম, হ্যাঙ্গার ডেক।
এই আক্রমণে ৩৯৬ জন নিহত ও ২৬৪ জন আহত হন। একটি মাত্র হামলায় মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য এত বড় প্রাণহানি ছিল ইতিহাসে অন্যতম রেকর্ড। তবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায়ও বাঙ্কার হিল ডুবে যায়নি। ইঞ্জিনরুমের নাবিকেরা ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও জাহাজ সচল রাখেন, যা শেষ পর্যন্ত রণতরীটিকে রক্ষা করে।
জাপানি আত্মঘাতী পাইলটদের অসীম সাহস
কামিকাজে পাইলটদের মানসিকতা ছিল জটিল ও বহুমাত্রিক। অনেকেই ছিলেন তরুণ, সদ্য প্রশিক্ষণ শেষ করা। কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, যাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় সীমিত উড্ডয়ন অভিজ্ঞতা নিয়ে। আদর্শ, দেশপ্রেম, সামাজিক চাপ ও সামরিক নির্দেশ সব মিলিয়ে তারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন।
মার্কিন সেনাদের কাছে এই কৌশল ছিল সম্পূর্ণ ভিনগ্রহী। ওকিনাওয়ার কাদেনা এয়ারফিল্ডে থাকা তরুণ মেরিন পাইলটদের কাছে আত্মঘাতী আক্রমণের ধারণাই ছিল অবিশ্বাস্য। তবু বাস্তবতায় প্রতিদিনই তারা এমন শত্রুর মুখোমুখি হচ্ছিল, যার কাছে বেঁচে ফেরা কোনো লক্ষ্য নয়।
এই প্রেক্ষাপটেই ইতিহাসবিদরা বলেন, যদি জাপান আত্মসমর্পণ না করত এবং পারমাণবিক বোমা ব্যবহার না হতো, তবে ‘অপারেশন ডাউনফল’ নামে মিত্রবাহিনীর মূল ভূখণ্ডে আক্রমণের সম্ভাবনাও থাকতো, আর তা হতো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অভিযান। কামিকাজে কৌশল সেখানে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারত।
যুদ্ধ শেষে পার্ল হারবার, ইউএসএস মিসৌরি, সাবমেরিন বোফিশসহ বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত নিদর্শনগুলো কামিকাজে ইতিহাসকে জীবন্ত করে রেখেছে। সব মিলিয়ে, চাকাবিহীন বা স্থায়ী আন্ডারকারেজযুক্ত কামিকাজে বিমান শুধু সামরিক অস্ত্র ছিল নয়, তা ছিল এক ধরনের মানসিক যুদ্ধ। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা,আত্মোৎসর্গের মানসিকতা ও ভয়াবহ ধ্বংস এই সবকিছু মিলিয়ে কামিকাজে হামলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি।
এই ইতিহাস শুধু যুদ্ধজয়ের বা পরাজয়ের গল্প নয়, এটি মানুষের সিদ্ধান্ত, আদর্শ, ভুল ও আত্মত্যাগের জটিল দলিল। ওকিনাওয়া থেকে বাঙ্কার হিল প্রতিটি আঘাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধের চরম মুহূর্তে মানুষ কতটা দূর যেতে পারে, এবং তার মূল্য কত ভয়াবহ হতে পারে। হয়তো এ বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেই বিশ্বের কাছে অজানা সেই পারমাণবিক অস্ত্রকে জাপানে প্রথমবারের মতো ব্যবহারের মাধ্যমে সামনে আনতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র।
জাপানের সবচেয়ে বড় অভিযান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপানের শিল্প ও সামরিক শক্তি পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল আমদানিকৃত তেলের ওপর। জাপান তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৮০–৯০ শতাংশ আমদানি করত যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কিন্তু চীন ও ফরাসি ইন্দোচীনে আগ্রাসনের জেরে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪১ সালের জুলাইয়ে জাপানের ওপর পূর্ণ তেল নিষেধাজ্ঞা দেয়। এতে জাপানের হাতে থাকা তেল মজুত ছিল সর্বোচ্চ ১৮–২৪ মাসের জন্য। অর্থাৎ যুদ্ধ না করলেও জাপানের সামরিক ও অর্থনীতি অচল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে জাপান হাওয়াইয়ের ওয়াহু দ্বীপে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে অতর্কিত হামলা চালায় জাপান। দুই ঘণ্টার এই অভিযানে অংশ নেয় দেশটির ৩৫৩টি যুদ্ধবিমান। হামলায় ৫টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও ১৬টি, ধ্বংস হয় ১৮৮টি যুদ্ধবিমান। এতে ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি সামরিক ও বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং প্রায় ১২০০ জন আহত হন।
হামলার শুরুতে মার্কিন বাহিনী সম্পূর্ণভাবে হতবিহ্বল হয়ে পড়লেও সকাল ১০টার মধ্যে সীমিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জাপানি বাহিনী ফিরে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র ২৯টি জাপানি বিমান ও ৫টি ছোট সাবমেরিন ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। নিহত হয় ৬৪ জন জাপানি সেনা। পার্ল হারবার হামলার পরদিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট কংগ্রেসে ভাষণ দিয়ে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আহ্বান জানান। একজন ছাড়া সবাই যুদ্ধের পক্ষে ভোট দেন এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ করে।


