দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ভবিষ্যতে আর্জেন্টিনার সঙ্গে কোনও সংঘাত হলে যুক্তরাজ্যের পাশে নাও দাঁড়াতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই মন্তব্যের পেছনে উঠে এসেছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে ব্রিটেনের ভূমিকা। ট্রাম্পের অভিযোগ, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্রিটেন তাকে সহায়তা করেনি।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, জিবি নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে ব্রিটেন ‘তাকে সহায়তা করেনি’। তবে পরে তিনি বলেন, এই যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কোনও সহায়তার প্রয়োজন ছিল না। এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাজ্য প্রতিরক্ষা ব্যয় না বাড়ালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষ অবস্থান পরিবর্তন করা হতে পারে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাতে টেলিভিশনে বক্তব্য দেয়ার কথা রয়েছে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলের। সেখানে তিনি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার ‘ঐতিহাসিক’ দাবির বিষয়ে কথা বলবেন।
দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। দ্বীপপুঞ্জটি নিয়ে দুই দেশের সশস্ত্র সংঘাতের পর চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
ভবিষ্যতে ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যে কোনও ভূখণ্ডগত বিরোধ দেখা দিলে তিনি ‘যুক্তরাজ্যের পাশে দাঁড়াবেন’ কি না—জিবি নিউজের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘দেখুন, তাদের প্রথম যুদ্ধে আমি পাশে ছিলাম। সেটা অনেক আগের কথা। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে পুরো বিষয়টি দেখেছিলাম এবং আপনারা খুব ভালোভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিলেন। আপনারা বেশ শক্তভাবে এটি (দ্বীপপুঞ্জ) ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তবে জায়গাটি অনেক দূরে।’
এরপর ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, ‘তাই আপনাদের দেশ ভালো অবস্থায় নেই। ভুলে যাবেন না, আপনারা হরমুজ প্রণালি থেকে বিপুল পরিমাণ তেল পান এবং আপনারা আমাকে সহায়তা করতে সেখানে ছিলেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের দেশ আমাকে সহায়তা করতে সেখানে ছিল না। আমাদের সহায়তার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আমি ন্যাটোকে বলেছিলাম এবং আপনাদের সাবেক নেতাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনারা কেন দু-একটি জাহাজ পাঠালেন না?’’
ট্রাম্প বলেন, তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তাকে জানিয়েছিলেন, (যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায়) পাঠানোর মতো কোনও জাহাজ ছিল না। বিষয়টিকে ‘খুবই দুঃখজনক’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘ন্যাটোও সেখানে ছিল না, যদিও ওই দেশগুলোর বেশিরভাগই সেখান থেকে তাদের তেলের বড় একটি অংশ পায়। তাই আমরা নিজেরাই এটি করছি।’
১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ হয়েছিল। ভূখণ্ডটির ওপর নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে আর্জেন্টিনার সেনারা ফকল্যান্ডে অবতরণ করলে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।
৭৪ দিন ধরে চলা ওই যুদ্ধে ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনাসদস্য, তিনজন দ্বীপবাসী এবং ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনাসদস্য নিহত হন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাজ্যের কার্যকর প্রশাসনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে দ্বীপগুলোর সার্বভৌমত্ব কার—সে বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিক কোনও অবস্থান নেয়নি।
ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে কি না, এর আগে বিবিসির এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি সব অবস্থানই পর্যালোচনা করি। এটিও এমন অনেক বিষয়ের মধ্যে একটি।’
এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্য সরকার বলেছে, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা ‘ব্রিটিশ এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার তাদের রয়েছে’।
ব্রিটিশ সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, ‘দ্বীপবাসীরা বারবার ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থাকতে তাদের ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। তাদের প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি অটুট।’
২০১৩ সালে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে বাসিন্দারা বিপুলভাবে ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দেন। ওই গণভোটে ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটার এর পক্ষে ভোট দেন, বিপক্ষে ভোট দেন মাত্র তিনজন।


