মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২৬
মঙ্গলবার, জুন ১৬, ২০২৬
32.6 C
Dhaka
Homeখেলাম্যারাডোনাকে ঘিরে উন্মাদনার কথা কতটা জানতেন ম্যারাডোনা

ম্যারাডোনাকে ঘিরে উন্মাদনার কথা কতটা জানতেন ম্যারাডোনা

প্রকাশ: জুন ১৬, ২০২৬ ৭:০০

ডিয়েগো ম্যারাডোনার নামের যে ঘুর্ণিঝড়ে উথাল-পাথাল হয়েছে এ দেশের মানুষের হৃদয়, সেটা কি তাকে বোঝানো গেছে? প্রায় ১১ হাজার মাইল দূরত্বে পৃথিবীর দুই প্রান্তে বসবাস করার কারণে বিস্ময়কর এই প্রতিভার কাছাকাছি হওয়ার সুযোগ ছিল না।

আন্তর্জাতিক ফুটবল মঞ্চে দুই দেশের অবস্থান একদমই বিপরীত মেরুতে। শক্তিমত্তার দিক দিয়ে দুই দলের এতই ব্যবধান যে, একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার প্রশ্নই আসে না। তাহলে কীভাবে ম্যারাডোনাকে পৌঁছানো হয় হৃদয়ের অর্ঘ্য? একটি জনগোষ্ঠী তার জন্য যে উন্মাতাল, সেটা কীভাবে তার নজরে আসে? আসলে সে সময় তেমন সুযোগই ছিল না। তার নাগাল পাওয়াটা ছিল একরকম অসম্ভব। তবে সান্ত্বনা হতে পারে, ভালোবাসার তীব্রতা গভীরতর হলে কোনো না কোনোভাবে তা বোধকরি উদ্দিষ্ট জনের কাছে পৌঁছে যায়।

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা বাংলাদেশের দর্শকদের যে মুগ্ধতার আবেশে জড়িয়ে ফেলেন, সেই অনুরাগ পরবর্তীকালে ক্রমশ গভীরতর হয়। ১৯৯০ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যারাডোনাকে এ দেশের মানুষের অন্তরের আরও কাছে নিয়ে আসে। যদিও সেবারের আর্জেন্টিনা দলটির পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক ছিল না। তারপরও যেভাবে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ফাইনালে উঠে, তাতে দলটির সাফল্যের জন্য উন্মুখ হয়ে ছিলেন সমর্থকরা। রোমে ফাইনাল ম্যাচে খেলার ৮৫ মিনিটে বিতর্কিত এক পেনাল্টি গোলে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে যায় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। জার্মানরা শক্তিশালী দল হলেও অপেক্ষাকৃত দুর্বল আর্জেন্টনা তাদের গ্যাঁড়াকলে ফেলে দেয়। কোনো রকম স্বস্তিই দেয়নি। খেলাটি টাইব্রেকারে গড়ানোর দিকে ধাবিত হলেও পেনাল্টি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সব এলোমেলো করে দেয়।

এ ম্যাচে এমন সব ঘটনা ঘটেছে, এর আগে ফাইনালে তেমনটি দেখা যায়নি। যার সূত্রপাত ঘটে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়কে লাল কার্ড দেখানোর মাধ্যমে। মেক্সিকোর রেফারি কোডেসাল মেন্ডিসের অনেক সিদ্ধান্তই মানতে পারেনি আর্জেন্টিনা দল। খেলা শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েন আপাতদৃষ্টিতে কঠিন হৃদয়ের অধিকারী ম্যারাডোনা। আর এ কান্না ছুঁয়ে যায় বাংলাদেশজুড়ে। তা যে কতটা হৃদয়স্পর্শী, তা বোঝানো যাবে না। সেদিন কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে ম্যারাডোনা বলেন, ‘আমি অনেকক্ষণ ধরেই কাঁদছিলাম। ফুটবলই আমার জীবন। দ্বিতীয় স্থান পাওয়ার জন্য আমি কাঁদি না। যেভাবে আমাদের হারানো হয়েছে, সেই দুঃখেই কেঁদেছি। রেফারির ‘অশুভ কালোহাত’ জার্মানদের জিতিয়ে দিয়েছে।

ম্যারাডোনার কান্না আর ক্ষোভে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তার ভক্ত-অনুরাগীরা তা একদমই মানতে পারেননি। দুঃখ-ক্ষোভ-বেদনায় মুষড়ে পড়ে কেউ কেঁদেছেন। কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কেউ কেউ ফুঁসে উঠে রাজপথে নেমেছেন। সোচ্চার হয়েছেন রেফারির বিরুদ্ধে। নানান রকম স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠেন। রেফারির কালোহাত ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি তার ফাঁসি দাবি করা হয়েছে। পোস্টার, ব্যানার, দেওয়াল লিখনে ছেয়ে যায় চারপাশ। জাতীয় সংসদে রেফারির পক্ষপাতিত্বের তীব্র সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় একজন সংসদ সদস্য একটি নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করলে সরকার ও বিরোধী দলীয় সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে সমর্থন জানান। দীর্ঘ বিতর্কের পর স্পিকার প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন।

এরশাদ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে আর্জেন্টিনা সমর্থক গোষ্ঠীর এক সভায় ‘পথকলি ট্রাস্ট্র’-এর সৌজন্যে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচে অংশ গ্রহণের জন্য ম্যারাডোনাকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ম্যারাডোনাকে নিয়ে বাংলাদেশে যেভাবে আলোড়ন, আন্দোলন ও বিক্ষোভ হয়েছে, বোধকরি আর্জেন্টিনায়ও তেমনটা হয়নি। কিন্তু এত সব কর্মকাণ্ড যাকে ঘিরে, সেই ম্যারাডোনার তা কর্ণগোচর হয়েছে কি-না সেটা অবশ্য জানা যায়নি।

১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে বাংলাদেশে ম্যারাডোনার জনপ্রিয়তা হয়ে উঠে আকাশচুম্বী। গ্রিস আর নাইজেরিয়াকে উড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে যথারীতি তিনি ক্যারিশমা দেখিয়েছেন। গ্রিসের বিপক্ষে একটি গোল আর দুরন্ত গতির নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোলটির জন্য ডি-বক্সের বাইরে থেকে ফ্রি-কিক নেওয়ার সময় বল ঠেলে দেন বাঁ প্রান্তে দাঁড়ানো ক্যানিজিয়াকে। এক গোল হজমের পর উপুর্যুপরি দুই গোল দিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন রিভার প্লেতের দুর্দান্ত গতির এই উইঙ্গার।

এ ম্যাচটি যে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ম্যারাডোনার অন্তিম ম্যাচ হবে, কেউ কি ভাবতে পেরেছিলেন? কারণ দুই ম্যাচ জিতে চাপমুক্ত আর্জেন্টিনার এরপর হালকা মেজাজে বুলগেরিয়ার মুখোমুখি হওয়ার কথা। এ ম্যাচে ম্যারাডোনার জন্য অপেক্ষা করছিল বিশ্বকাপে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার মাইলফলক। কিন্তু ম্যাচের আগেই দুঃস্বপ্নের মতো হাওয়ায় বেগে ছড়িয়ে পড়ে ম্যারাডোনার খেলতে না পারার মর্মবিদারী খবর। ডোপ টেস্টে নিষিদ্ধ ড্রাগ (এফিড্রিন) ধরা পড়ায় তাকে বহিষ্কার করা হয়।

মাদক সেবনের অভিযোগে বিশ্বকাপ ফুটবল হতে বহিষ্কৃত হওয়ার পর আর কখনও না খেলার কথা জানিয়ে আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে অশ্রুসিক্ত ম্যারাডোনা বলেন, ‘তারা আমাকে শেষ করে দিয়েছে। আমি আমার পাওনা পরিশোধ করেছি, তারা বিবেকের দংশন ছাড়াই আমার মাথায় আঘাত করেছে, আমার পা কেটে রেখেছে’। নিজের মেয়েদের মাথায় হাত রেখে শপথ করে বলেন, ‘আমি নিষিদ্ধ ঔষধ সেবন করিনি। যখন ড্রাগ নিয়েছি, তখন তা স্বীকার করেছি। বিচারকের কাছে গিয়েছি এবং অর্থদণ্ড পরিশোধ করেছি। কিন্তু এবার শপথ করে বলছি, আমি নিষিদ্ধ ঔষধ সেবন করিনি’।

ম্যারাডোনাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করায় স্বপ্ন ভঙের বেদনায় ক্ষোভের অনলে পুড়তে থাকে বাংলাদেশের ম্যারাডোনার সমর্থকরা। ম্যারাডোনা আর খেলতে পারবেন না, এই খবর যেন ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আত্মীয় বিয়োগের চাইতেও মর্মন্তুদ দুঃসংবাদ হয়ে আসে। পুরো দেশে নজিরবিহীন ক্ষোভের জন্ম দেয়। গভীর জনরোষ ও তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। মর্মাহত ভক্তরা আর্জেন্টাইন সুপারস্টারের সমর্থনে অগ্নিগর্ভ বিক্ষোভের আয়োজন করে। ‘বাংলাদেশ ম্যারাডোনা ইয়ুথ ফ্যান ক্লাব’ বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম মিনিটে ভক্তদের টেলিভিশন বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়ে একটি প্রচারণার আয়োজন করে। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠে ম্যারাডোনা ফ্যান ক্লাব। ম্যারাডোনার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে এই ক্লাবগুলো স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান পরিচালনা করে।

ম্যারাডোনার প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন ভবনের শিখরে উড়ান হয় আর্জেন্টিনার নীল-সাদা রঙের পতাকা। তার ছবি শোভা পায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। ফিফার নিন্দা এবং বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার দাবি করে ইংরেজী ও বাংলা ভাষায় লেখা পোস্টার বিভিন্ন স্থানে টানানো হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ম্যারাডোনার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে মিছিল করা হয়। সবার হাতে ছিল ম্যারাডোনার প্রতিকৃতি। ব্যানার, ফেস্টুনে লেখা ছিল ‘ফিফা নিপাত যাক’, ‘ম্যারাডোনার বহিষ্কারাদেশ বাতিল কর’, ‘ষড়যন্ত্র হতে ফুটবলকে রক্ষা কর’ ইত্যাদি। স্লোগানে স্লোগানে মিছিলকারীরা রাস্তা মুখরিত করে রাখেন। ম্যারাডোনার ছবির চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

যে সব প্রতিষ্ঠান ছবি ও কার্ডের ব্যবসা করেছে, ম্যারাডোনার হাজার হাজার রঙিন ছবি ছাপিয়েও তারা চাহিদা মিটাতে হিমসিম খেয়ে যায়। ম্যারাডোনাবিহীন বিশ্বকাপ সমর্থকদের কাছে আকর্ষণহীন হয়ে যায়। শোকে-দুঃখে অনেকেই টেলিভিশনে খেলা দেখাই ছেড়ে দেন। তাদের মনে হয়েছে, এ তো ‘ডেনমার্কের রাজপুত্র ছাড়া হ্যামলেট নাটক মঞ্চস্থ’ হওয়ার মতো। কোথাও কোথাও ফিফা সভাপতি জোয়াও হ্যাভেলাঞ্জের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। ভক্তরা এই বহিষ্কারকে একটি অবৈধ ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করে এবং ম্যারাডোনাকে পুনর্বহাল করার দাবি জানায়।

বাংলাদেশের একজন আইনজীবী ফিফা প্রধানের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। তিনি দাবি করেন যে, টুর্নামেন্ট থেকে ম্যারাডোনাকে বহিষ্কার করাটা ছিল বেআইনি এবং এর ফলে বাদী মানসিক বিপর্যয় শিকার হয়েছেন। মামলার জবাব দিতে বাংলাদেশের একটি আদালত ফিফার সভাপতি জোয়াও হ্যাভেলেঞ্জকে তলব করে। পুরো ফুটবলদুনিয়া জেনে যায়, বাংলাদেশের বিক্ষুব্ধ ম্যারাডোনা সমর্থকদের কথা। এই বিপুল সমর্থন বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদের কাছে ম্যারাডোনার কিংবদন্তিতুল্য প্রায় পৌরাণিক মর্যাদাকে তুলে ধরে এবং ডোপিং বিতর্ককে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এত সব আলোড়ন সৃষ্টিকারী কাণ্ডকীর্তি কি ম্যারাডোনা জানতে পেরেছেন?

অবশ্যই জানারই কথা। এত এত মানুষের ভালোবাসার কথা তার কাছে না পৌঁছানোর কারণ নেই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, তার সফরসঙ্গী এবং তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে নিশ্চয়ই জেনেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময় আর্জেন্টাইন ফুটবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, যারা বাংলাদেশে এসেছেন বা কাজ করেছেন, তারাও ম্যারাডোনার কাছে এ দেশের সমর্থকদের আবেগের গল্প অবহিত করার কথা। তার অগণিত সমর্থকদের উন্মাদনা ও কর্মকাণ্ড, বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের সমর্থকদের বিশাল জমায়েত ও আর্জেন্টিনা দলের প্রতি ভালোবাসার দৃশ্য প্রায়ই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হতো। তা তার গোচরে যাবে না, এমনটা ভাবার কারণ নেই।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ম্যারাডোনাকে এ দেশে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য তার এজেন্টদের সঙ্গে প্রায়শই যোগাযোগ করতেন এবং তার ঢাকা সফরের পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত হয়েছিল। সে বিষয়টি অবশ্যই তার গোচরে থাকবে না? ২০১১ সালে সেপ্টেম্বরে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে বাংলাদেশ সফরে আসে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। দলের কোচ থাকলে ম্যারাডোনার আসার সম্ভাবনা ছিল। তবে এই দলে ছিলেন তার মেঝো মেয়ে জিয়ানিন্নার স্বামী ফুটবলার সার্জিও আগুয়েরো। জামাইয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে তার অনুরাগীদের সম্পর্কে কি জানতে পারেননি?

বাংলাদেশে ম্যারাডোনাকে ঘিরে আবেগ, উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা, প্রমত্ততা বা ক্ষিপ্রতার কথা তিনি কম-বেশি অবহিত হয়েছেন, তা ধরেই নেয়া যায়। কিন্তু সেটা কতটা? একটা ভূখন্ড যে তার জন্য আকুল হয়ে কেঁদেছে এবং তীব্রভাবে কেঁপে উঠেছে, তা তিনি কতটা অনুভব বা অনুধাবন করতে পেরেছেন, সেই কৌতূহলটুকু অবশ্য রয়েই গেছে।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় খবর