মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
32 C
Dhaka
Homeবাংলাদেশতেলের দাম বাড়ানোর সরকারের যুক্তিগুলো কী ঠিক?

তেলের দাম বাড়ানোর সরকারের যুক্তিগুলো কী ঠিক?

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬ ১০:২৩
প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬ ১০:১৯

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে এক লাফে ২০ টাকা বেড়েছে৷ একবারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার এটি একটি রেকর্ড৷ দাম বাড়ানোর পক্ষে কয়েকটি যুক্তি দিয়েছে সরকার৷ তবে কিছু বিশ্লেষক এসবের সঙ্গে একমত নন৷

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত থেকে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে৷ এখন নতুন দর অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে৷ গত জুনে তিন ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল৷ তখন ডিজেল ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন ১৩০ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকা থেকে ১৪৫ টাকা করা হয়৷

সরকারের যুক্তি কী

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সচিবালয়ে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির কারণেই দেশে দাম বাড়াতে হয়েছে৷ মধ্যপ্রাচ্য সংকট প্রতিদিন নতুন মাত্রায় আবির্ভূত হচ্ছে৷ তেলের দাম বাড়ছে, জাহাজ ভাড়া বাড়ছে৷ এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না৷ উপায়হীন না হলে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তটি সরকার নিতে চাইবে না কিংবা নেবে না৷’’

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বলছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে৷ বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী শুধু ডিজেলেই বিপিসির লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে দাবি করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দৈনিক এ লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা৷ এ হারে এক বছরে শুধু ডিজেলেই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে৷

চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে সরকার মনে করছে৷

সরকার বলছে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় জ্বালানি তেলের দাম এখনো বাংলাদেশে কম৷ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাবে, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ভারতের কলকাতায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা এবং শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা৷ থাইল্যান্ডে এ দাম ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা৷

বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, দেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকায় ভারতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে৷

মন্ত্রণালয় বলছে, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে৷ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও সরকার দেশে সেই হারে দাম বাড়ায়নি বলে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে৷

‘আসল কারণ আইএমএফ-এর চাপ’

তবে মধ্যপ্রাচ্যে এই সংকটের মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে৷ জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে এখন এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন৷

ঢাকা চেম্বার এন্ড কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই) এর সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, ‘‘সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তিগুলো দেওয়া হচ্ছে সেগুলো জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর আসল কারণ নয়৷ আসল কারণ হলো আইএমএফ-এর চাপ৷ ঋণের পরবর্তী কিস্তি পেতে তারা সরকারকে ভর্তুকি কমাতে বলছে৷ সরকার তাই করল৷ ডিজেলের দাম কম হলে প্রতিবেশী দেশে পাচার হবে এটা রাজনৈতিক কথা৷ আমরা তো ভারত থেকেই এখন ডিজেল আমদানি করছি৷ এটা ঠিক, ভারতের চেয়ে কোনো পণ্যের দাম বাংলাদেশে কম হলে সেটা পাচার হওয়ার আশঙ্কা থাকে৷ কিন্তু এটা দাম বাড়ানোর কোনো যুক্তি হতে পারে না৷’’

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ আরও বলেন, ‘‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরওতো সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না৷ সৌদি আরবে, কাতারে সমস্যা৷ কিন্তু সরকারতো বিকল্প উৎস খুঁজছে না৷ আর আন্তর্জাতিক বাজারেতো জ্বালানি তেলের দাম অব্যাহতভাবে বাড়ছে না৷ বাড়ে-কমে৷ এখন তো কমছে৷ বিপিসিকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ঠিক৷ কিন্তু এই খাতে চুরি এবং সিস্টেম লস কমানো হচ্ছে না৷ সেটা করতে পারলেতো সাশ্রয় হতো৷ আর ওভারনাইট এমন কী হলো যে লিটারে ২০ টাকা বাড়াতে হবে৷ এটা তো একবারে অনেক বেশি৷’’

শামস মাহমুদ বলেন, ‘‘তেলের দাম বাড়ানোর কারণে রপ্তানি শিল্প থেকে সব ধরনের শিল্প উৎপাদনে খরচ বেড়ে যাবে, পরিবহণ খরচ বাড়বে৷ কৃষি উৎপাদনের খরচ বাড়বে৷ নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে৷ ফলে যারা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ তারা চাপে পড়বেন৷ চাপে পড়বেন নিম্নবিত্ত মানুষ৷ যেমন ধরেন বাচ্চা স্কুলে যায় তার জন্য যাতায়াত খরচ আগের চেয়ে বেড়ে যাবে৷ আপনি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছেন আবার তা দিতে পারছেন না, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেন তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? সাভারে যে গার্মেন্টস-এ সিলিন্ডার গ্যাস বিস্ফোরণে মানুষ মারা গেল৷ তারা নিয়মিত গ্যাস পেলেতো আর সিলিন্ডার ব্যবহার করতো না৷ বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার দিয়ে কারখানা সচল রেখেছে, যাতে নির্ধারিত সময়ে ক্রেতাকে পোশাক সরবরাহ করতে পারে৷ বুঝতেই পারছেন পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে৷’’

‘প্রত্যেক দেশের অর্থনীতির একটা ইউনিকনেস আছে’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘‘আসলে সরকারকে কোনো কোনো খাতে ভর্তুকি দিতে হবে সাধারণ মানুষের স্বার্থে৷ সরকার জ্বালানি খাতে যে পরিমাণ ভর্তুকির কথা বলছে সেটা না দিলে যে ক্ষতি হবে তার পরিমাণ ভর্তুকির চেয়ে অনেক বেশি৷ সরকারের উচিত রাজস্ব খাতে দক্ষতা বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানো৷ রাজস্বের নতুন কোনো খাত থাকলে সেটা বের করা৷ সেটা না করে জ্বালানির দাম বাড়াচ্ছে৷ এটা আমার কাছে তেমন গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না৷’’

তার কথা, ‘‘প্রতিবেশী দেশগুলো ও বিশ্বের সঙ্গে সবসময় তুলনা চলে না৷ কারণ প্রত্যেক দেশের অর্থনীতির একটা ইউনিকনেস আছে৷ সরকার হয়তো চাইছে দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমাতে৷ কিন্তু এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি হলেও তা একটা স্থিতিশীল জায়গায় আছে৷ কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে আবার তা বাড়বে৷ আর তার প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর৷’’

ড. বিদিশা বলেন, ‘‘ডিজেল ব্যবহার হয় পরিবহন এবং কৃষিখাতে৷ এখন পরিবহন ভাড়া বাড়বে৷ তারজন্য নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে৷ আবার কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়বে৷ সারের দাম বাড়বে৷ সেচের খরচ বাড়বে৷ শেষ পর্যন্ত এটা তো সাধারণ মানুষের ওপরে পড়বে৷ পুরো অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে৷ শিল্প উৎপাদন খরচ বাড়বে৷ যার প্রভাব রপ্তানি আয়ের ওপরও পড়বে৷ সরকারের বিকল্প চিন্তা করা উচিত৷ আর বিপিসিতো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম নিয়মিত সমন্বয় করে না৷ যখন দাম কমে তখন তো কমায় না৷’’

‘অকটেনের দাম কেন বাড়ানো হলো?’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘‘অকটেন তো দেশেই উৎপাদিত হয়৷ এখানে অকটেন সারপ্লাস আছে এক বছরের৷ তাহলে অকটেনের দাম কেন বাড়ানো হলো? আমরা বারবারই বলে আসছি, বিপিসিতো একটা লাভজনক প্রতিষ্ঠান৷ যখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে তখন তো তারা দাম কমায় না৷ তারাতো দাম সবসময় বাড়ায়৷ বিপিসির ইতিহাসে কখনোই বিশ্ব বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালনি তেলের দাম কমানো হয়নি৷ আমরা বারবার বলে আসছি আসলে জ্বালানি তেল নিয়ে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি কমালে এটা সহনীয় থাকত৷ আবার সরকার পে স্কেল দিল৷ এটা না দিয়ে ভর্তুকি দিলে সবাই এর সুবিধা পেত৷ আর রয়টার্সের আজকের খবর হলো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে৷ সেখানে উল্টো আমাদের এখানে বাড়ানো হলো।’’

এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘‘এখন সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে৷ সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়বে৷’’

‘সরকার নিরুপায় হয়ে দাম বাড়িয়েছে’

তবে অর্থনীতিবিদ ও নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, এখন যা পরিস্থিতি তাতে সরকার ‘নিরুপায়’ হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে৷ জ্বালানি হিসাবে ডিজেলের ব্যবহারই বেশি৷ ফলে দাম বাড়ার কারণে পরিবহণ, কৃষিখাতে প্রভাব পড়বে৷ কিন্তু সরকারকে নজরদারি এখন বাড়াতে হবে৷ কারণ আমরা আগেও দেখেছি জ্বালনির দাম বাড়ার পর আনুপাতিকহারে দাম না বেড়ে অনেক বেশি বাড়ে৷ যেমন পরিবহণ খাতে আরো নানা অজুহাত দেখিয়ে ভাড়া অনেক বেশি বাড়ানো হয়৷ এটা যেন না হয়৷ এখন আমরা উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে আছি৷ এটা আরো বাড়বে৷’’

ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, ‘‘সরকারের কোনো উপায় ছিল না৷ অব্যাহতভাবে তার পক্ষে ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব নয়৷ ফলে নিরুপায় হয়েই সরকার তেলের দাম বাড়িয়েছে৷ কিন্তু কৃষিসহ আরো কোনো কোনো খাতে কম মূল্যে জ্বালানি দিতে সরকার রেশনিং-এর কথা ভাবতে পারে৷ আর বিশ্ব বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম নিয়মিত সমন্বয় করা দরকার৷ হঠাৎ করে বাড়ালে তার প্রতিক্রিয়া হয়।”

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় খবর