মহান রাব্বুল আলামিনের নির্দেশের পরিপন্থি সব কাজই গুনাহ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর গুনাহ বা পাপ মূলত ২ ধরনের হয়ে থাকে- ‘সগিরা’ বা ছোট গুনাহ এবং ‘কবিরা’ বা বড় গুনাহ।
এ ক্ষেত্রে সগিরা গুনাহ বিভিন্ন নেক আমলের মাধ্যমে মাফ হলেও তওবা ছাড়া কবিরা গুনাহ মাফ হয় না। এমনকি কোনো কোনো কবিরা গুনাহের ক্ষেত্রে তওবা না করে মারা গেলে নিশ্চিত জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথাও হাদিসে এসেছে। তাই পাপ বা গুনাহ হয়ে গেলে পবিত্র হতে মহান রবের কাছে তওবার বিকল্প নেই।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদারেরা, তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো, আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবহমান।’ (সুরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৮)
অন্যদিকে গুনাহ বা পাপ হয়ে গেলে যদি কেউ খাঁটি তওবা করে, তবে মহান রাব্বুল আলামিন অত্যন্ত খুশি হন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তা’য়ালা বান্দার তওবার কারণে সেই লোকটির চাইতেও বেশি খুশি হন, যে লোকটি মরুভূমিতে তার উট হারিয়ে পরে তা আবারও পেয়ে যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৭০)
এ ক্ষেত্রে বেশকিছু আমল রয়েছে, যেগুলো করলে মহান রাব্বুল আলামিন বান্দার সগিরা বা ছোট ছোট গুনাহগুলো মাফ করে দেন। নিচে ৩টি আমলের কথা তুলে ধরা হলো, যেগুলোর মাধ্যমে গুনাহ মাফ হওয়ার পাশাপাশি বান্দা মায়ের পেট থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়।
- হজ-ওমরা করা
ইসলামের ৫টি মূল ভিত্তির একটি হলো হজ। সামর্থ্যবান প্রত্যেকের জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ। খোদ মহান রাব্বুল আলামিনের কাছেও হজ সর্বোত্তম আমলগুলোর মধ্যে একটি। বিভিন্ন হাদিসে হজ ও ওমরা আদায়ের বিশেষ ফজিলতের কথাও এসেছে।
ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন— তোমরা ধারাবাহিকভাবে হজ ও ওমরা আদায় করো। কেননা এ দু’টি ধারাবাহিকভাবে আদায় করলে তা দারিদ্র ও গুনাহ দূরীভূত করে, যেমন হাপর (কামারের চুল্লিতে আগুন জ্বালাতে বাতাস সরবরাহকারী যন্ত্রবিশেষ) লোহার মরিচা দূর করে। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ২৮৮৭; মেশকাত, হাদিস: ২৫২৪)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অপর একটি হাদিসে এসেছে, আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি— যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে বিরত রইল, সে নবজাতক শিশু, যাকে তার মা এ মুহূর্তেই প্রসব করেছে, তার ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে ফিরবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৩১)
- বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ ও মহান রবের ওপর সন্তুষ্ট থাকা
দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের পরীক্ষায় বিপদ-আপদের সময় ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি মহান রবের নিকট সাহায্য চাওয়া প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকার ওয়াদা স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালার। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৩)
বিপদ-আপদের সময় অবশ্যই মনে রাখতে হবে— বিপদ যত তীব্র হয়, ধৈর্যধারণ করলে আল্লাহ তা’য়ালা কর্তৃক এর প্রতিদানও তত বড় হয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যাণ কামনা করেন, তাকে তিনি মুসিবতে (বিপদ-আপদ) লিপ্ত করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৪২)
আনান ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন— বিপদ যত তীব্র হবে, প্রতিদানও তদনুরূপ বিরাট হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতিকে ভালোবাসলে তাদের পরীক্ষা করেন। যে কেউ তাতে সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর যে কেউ তাতে অসন্তুষ্ট হয়, তার জন্য রয়েছে অসন্তুষ্টি। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৪০৩১)
এমনকি আল্লাহ প্রদত্ত বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করে মহান রবের ওপর সন্তুষ্ট থাকার মাধ্যমে গুনাহও মাফ হয়। সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, একবার আমি বললাম— হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! কোন মানুষের সর্বাপেক্ষা কঠিন পরীক্ষা হয়? জবাবে রাসুল (সা.) বললেন— নবীগণের। অতঃপর মর্যাদার দিক থেকে তাদের পরবর্তীদের, অতঃপর তাদের পরবর্তীগণের। বান্দাকে তার দীনদারির মাত্রা অনুসারে পরীক্ষা করা হয়। যদি সে তার দীনদারিতে অবিচল হয়, তবে তার পরীক্ষাও হয় ততটা কঠিন। আর যদি সে তার দীনদারিতে নমনীয় হয়, তবে তার পরীক্ষাও তদনুপাতে হয়। অতঃপর বান্দা অহরহ বিপদ-আপদ দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। শেষে সে পৃথিবীর বুকে গুনাহমুক্ত হয়ে পাকসাফ অবস্থায় বিচরণ করে। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৪০২৩)
- উত্তমরূপে অজু ও মহান আল্লাহর প্রশংসা
পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম অজু। এর মধ্যদিয়ে বান্দার গুনাহও মাফ হয়। এমনকি উত্তমরূপে অজু করার পর মহান আল্লাহ তা’য়ালার প্রশংসা করলে বান্দার জন্য জান্নাতের ৮টি দরজাই খুলে দেয়ার কথাও হাদিসে এসেছে।
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন— যখন কোনো মুসলিম অথবা মুমিন বান্দা অজু করে আর সে তার মুখ ধৌত করে, তখন অজুর পানি অথবা অজুর পানির শেষ ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারা থেকে সব গুনাহ বের হয়ে যায়। যা সে তার দু’চোখ দিয়ে দেখেছিল। আর যখন সে তার দু’হাত ধৌত করে তখন অজুর পানি বা অজুর পানির শেষ ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তার উভয় হাত থেকে সকল গুনাহ বের হয়ে যায়, যা সে হাত দিয়ে ধরেছিল, এমনকি শেষ পর্যন্ত সে তার গুনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ২, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৭০)
উমার ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন— যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অজু করার পর বলে— “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ তা’য়ালা ব্যতীত আর কোনো ইলাহ (মাবুদ) নেই, তিনি এক, তার কোনো শরিক নেই; আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও তারই রাসুল; হে আল্লাহ! আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো এবং আমাকে পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর”— তার জন্য জান্নাতের ৮টি দরজাই খুলে দেয়া হবে। সে নিজ ইচ্ছামতো যেকোনো দরজা দিয়েই তাতে যেতে পারবে। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ৫৫)
এ ছাড়াও মুআবিয়া ইবনু সালেহ (রহ.) থেকে বর্ণিত অপর একটি হাদিসে এসেছে, একবার রাসুল (সা.) সাহাবিদের অজু কীভাবে করতে হয়— এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, অজু! তুমি যখন অজু করো এবং তোমার হস্ত তালুদ্বয় ধৌত কর এবং পরিষ্কার করে ধৌত করো, তখন তোমার পাপসমূহ তোমার নখের ভেতর থেকে এবং তোমার আঙ্গুলের অগ্রভাগ থেকে বের হয়ে যায়। এবং যখন তুমি কুলি করো এবং নাকের ভেতরকার অংশ ধৌত করো, তোমার মুখমণ্ডল ধৌত করো এবং কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো এবং মাথা মসেহ্ করো এবং গোড়ালি পর্যন্ত পা ধৌত করো, তখন তুমি তোমার সাধারণ পাপসমূহ ধুয়ে ফেললে। আর যখন তুমি তোমার মুখমণ্ডল আল্লাহ তা’য়ালার জন্য স্থাপন করো, তখন তুমি তোমার পাপ থেকে ওইদিনের মতো মুক্ত হয়ে যাও, যেদিন তোমার জননী তোমাকে জন্ম দিয়েছিল। (সুনান আন-নাসায়ী, হাদিস: ১৪৭)


