যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামরিক ও কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের জেরে যুক্তরাষ্ট্রকে
২০২৬ বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একদল সংসদ সদস্য।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবার, লিবারেল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি ও প্লাইড কামরুর মোট ২৩ জন এমপি সংসদে একটি প্রস্তাবে সই করেছেন। সেখানে আন্তর্জাতিক আইন ও অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে বিশ্বকাপসহ বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বহিষ্কারের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর উত্তেজনা
এই বিতর্কের সূত্রপাত চলতি মাসে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর এক ঝটিকা অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করার ঘটনায়। ভেনেজুয়েলার সরকার একে ‘সরাসরি আগ্রাসন’ ও আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, মাদুরো একজন ‘অবৈধ নেতা’, যিনি মাদক পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। হোয়াইট হাউস একে আইন প্রয়োগমূলক অভিযান বলে উল্লেখ করেছে। তবে মাদুরো নিজেকে যুদ্ধবন্দী বলে দাবি করেছেন।
ঘটনাটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। জরুরি বৈঠকে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নিয়ম মানা হয়নি, এ নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
যুদ্ধের হুমকি বনাম ‘শান্তি পুরস্কার’
ঘটনার আরেকটি দিক ক্রীড়াঙ্গনকে আরও বিব্রত করছে। গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ফিফা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাদের প্রথম ‘শান্তি পুরস্কার’ দেয়। ফিফার ভাষ্য ছিল, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে ভূমিকার জন্য ট্রাম্প এই স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।
কিন্তু এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়েছে ভেনেজুয়েলা ও নাইজেরিয়ায়। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড, মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধেও সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশ এমপিরা যৌথ বিবৃতিতে বলেন, বিশ্বকাপ বা অলিম্পিকের মতো আন্তর্জাতিক আসরকে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘনের হাতিয়ার হতে দেয়া যায় না।
মেক্সিকো, কলম্বিয়া ও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উদ্বেগ
ট্রাম্প মেক্সিকো দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবেশের অভিযোগ তুলে বলেছেন, ‘আমাদের কিছু একটা করতেই হবে।’ মার্কিন সেনা পাঠানোর পরিকল্পনার খবর সামনে আসার পর মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মেক্সিকোর ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক অভিযান তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বিবিসিকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের ‘বাস্তব হুমকি’ তৈরি হয়েছে। তার মতে, মাদক পাচারের অজুহাতে ওয়াশিংটন সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
এদিকে গ্রিনল্যান্ড নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্য ইউরোপে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। খনিজসমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে, যা ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র।
ফিফা ও আইওসির নীতিগত দ্বন্দ্ব
ইউক্রেনে আগ্রাসনের দায়ে রাশিয়াকে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক থেকে নিষিদ্ধ করেছিল ফিফা ও আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি)। এই প্রসঙ্গ টেনে ব্রিটিশ এমপি ব্রায়ান লেইশম্যান প্রশ্ন তুলেছেন, রাশিয়ার ক্ষেত্রে যে নীতি প্রযোজ্য, আমেরিকার ক্ষেত্রে তা কেন নয়?
তবে ফিফা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিষয়টিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
আইওসি ইতোমধ্যে জানিয়েছে, ইতালিতে অনুষ্ঠিতব্য শীতকালীন অলিম্পিকে মার্কিন অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণে কোনো বাধা থাকবে না। বিবিসি স্পোর্টকে দেয়া এক বিবৃতিতে আইওসি বলেছে, অ্যাথলেটদের মিলনমেলাই আমাদের কাছে মুখ্য। রাজনীতি আমাদের আওতার বাইরে।
২০২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে অলিম্পিক আয়োজনের কথা রয়েছে।
সামনে বড় পরীক্ষা
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনবিষয়ক বিশ্লেষক জন জেরাফা মনে করেন, সামনে ফিফা ও আইওসির জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তিনি বলেন, এই সংস্থাগুলোর সনদেই শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও বৈষম্যহীনতার কথা বলা আছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোভুক্ত ডেনমার্কের অধীন গ্রিনল্যান্ডে বল প্রয়োগ করে, তখন কি একই নীতি কার্যকর হবে?
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ইরান, হাইতি, সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের সমর্থকদের পূর্ণ বা আংশিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হচ্ছে।
সর্বপোরি ফিফা ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ একটি ঐক্যবদ্ধ ও বন্ধুত্বপূর্ণ বিশ্বকাপ আয়োজনের আশ্বাস দিলেও বাস্তবতায় রাজনীতি ও ক্রীড়ার দূরত্ব ক্রমেই ঘুচে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই রাজনৈতিক অস্থিরতা মাঠের ফুটবলকে কতটা প্রভাবিত করবে সেই দিকেই এখন তাকিয়ে বিশ্ব।


