গত কয়েকদিনের চিত্রে দেখা যায়, হাজার হাজার পশুর চামড়া অবহেলায় রাস্তায় পড়ে পচছে, বাতাসে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। অথচ এই চামড়াই হওয়ার কথা ছিল দেশের অর্থনীতির বড় এক চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতির অন্যতম এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর পচে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্ভাবনা।
রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা শহর ও গ্রামে চামড়া শিল্পের এই করুণ দৃশ্য দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার বেশকিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি ফেনীর দাগনভূঞার মাতুভূঞা এলাকার একটি সেতু থেকে ছোট ফেনী নদীতে গরুর চামড়া ফেলছেন। এছাড়া ক্রেতা না পাওয়ায় অনেককেই রাস্তা-মাঠে চামড়া ফেলে রেখে চলে যেতে দেখা গেছে। দুর্গন্ধের হাত থেকে বাঁচতে বিভিন্ন স্থানে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার খবরও পাওয়া গেছে। এছাড়া, গাইবান্ধায় মহাসড়কের পাশে চামড়া ফেলে গেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
প্রশ্ন উঠছে, বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন এমন করুণ দশায় নিপতিত দেশের চামড়া শিল্প? পশুর দাম ও জোগানের অসামঞ্জস্য নাকি পরিকল্পিত কোনো অব্যবস্থাপনা—এই অপচয়ের নেপথ্যে আসলে কী?
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে চামড়া উৎপাদন বাড়লেও দিন দিন কমছে রপ্তানি। উল্টো চামড়াজাত পণ্য তৈরির জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হচ্ছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার বিস্তারের জন্য ২০১৭ সালে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর করা হয় সাভারের হেমায়েতপুরে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে চামড়া শিল্প নগরী গড়ে তোলা হয়েছিল, তা কতটা পূরণ হচ্ছে—সেই প্রশ্ন সামনে আসছে।
খুচরা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, তারা চামড়ার চার ভাগের এক ভাগ দামও পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতির জন্য তারা আড়তদার এবং ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন। তাদের দাবি, লবণযুক্ত চামড়ার মতো কাঁচা চামড়ারও যেন একটি নির্দিষ্ট দাম সরকার নির্ধারণ করে দেয়।
রাজধানীর এক কুরবানির চামড়া বিক্রেতা রহিম মিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কুরবানির সময় অনেক আশা নিয়ে চামড়া বিক্রি করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আড়তদাররা যে দাম বলছে, তাতে চামড়া পরিবহনের ভাড়াই ওঠে না। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে ফেলে দিতে হয়েছে। চামড়া বিক্রি করে উল্টো পকেট থেকে টাকা গুনতে হবে, এমন অবস্থা হলে মানুষ আর কেন চামড়া যত্ন করে রাখবে?
ময়মনসিংহের আরেক মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, লবণের দাম বেশি, আবার সময়মতো ট্যানারিগুলো চামড়া নিতে চায় না। পচে গন্ধ ছড়ালে এলাকার মানুষ গালি দেয়। উপায় না দেখে নদীতে ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।
ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সিন্ডিকেট করে এই পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, চাহিদা নেই বললেই চলে। সবাই সিন্ডিকেট করছে, বাধ্য হয়ে চামড়া ফেলে দিয়ে আসতে হচ্ছে। সরকার যদি দাম নির্ধারণ করে না দেয়, তবে মাদ্রাসা বা সাধারণ মানুষ যারা চামড়া সংগ্রহ করে, তারা কোনো মূল্যই পাবে না।
তবে ব্যবসায়ীদের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আড়তদাররা। তাদের দাবি, বাজারে চামড়ার সরবরাহ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। এর বড় একটি অংশ সরাসরি সাভারের হেমায়েতপুরে চলে যাচ্ছে। এছাড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের মোটা অঙ্কের টাকা আটকে থাকায় তাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা কমে গেছে।
একজন আড়তদার জানান, আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পুঁজি বা আর্থিক ব্যাকআপ নেই, যার ফলে আগের মতো চামড়া কেনার সক্ষমতা আমাদের আর নেই।
এদিকে চামড়া শিল্পের এই করুণ দশা আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। যখন একটি পণ্যের উৎপাদন খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ তার বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি হয়, তখন তা অর্থনৈতিকভাবে অবাস্তব হয়ে পড়ে। ট্যানারিগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারেও আমাদের চামড়া চাহিদা হারাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চামড়া শিল্পের এমন করুণ দশার পেছনে কাজ করছে একাধিক নেতিবাচক প্রভাবক। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাজার ব্যবস্থাপনায় ধস। পশুর চামড়ার সঠিক দাম না পাওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ, সবাই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ফলে চামড়া সংগ্রহের চেয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়াকেই অনেকে সহজ পথ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
অপরদিকে চামড়া সংগ্রহের পর তা প্রক্রিয়াজাত করার চেইন বা সিন্ডিকেটের কারণে প্রান্তিক বিক্রেতারা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সঠিক সময়ে লবণের ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারায় অনেক চামড়া দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, চামড়া শিল্প নগরীতে দীর্ঘদিনের জটিলতা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এই শিল্পের প্রধান সংকট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পরিবেশ দূষণের অজুহাতে অনেকে এই শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ শ্রমিকের অভাবে আমাদের দেশের চামড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চামড়া শিল্পকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—চামড়া সংগ্রহের সময় প্রান্তিক পর্যায়ে লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করা, দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজার উপযোগী ট্যানারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শতভাগ সাফল্য অর্জন করা। পাশাপাশি একটি সুষ্ঠু দাম নির্ধারণ ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা এই ‘কালো সোনা’ আবারও দেশের অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে।
জনপ্রতিনিধি ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে চামড়া শিল্পকে অপরাধ বা অব্যবস্থাপনার হাত থেকে মুক্ত করে উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নতুবা প্রতিবছর এভাবেই সম্পদ নষ্টের ভিডিও ছড়িয়ে পড়বে।
চামড়া ব্যবসায়ী মো. শওকত বলেন, চামড়া বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরির টাকাও মেলে না। ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য কিছু চামড়া সংগ্রহ করছি। সরকার চামড়ার একটি দাম ঠিক করলেও বাস্তবে এই দামে কেনাবেচা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। গত বছরের চামড়া এখনো বিক্রি করতে পারিনি। ট্যানারিগুলোর কাছে ব্যবসায়ীদের টাকা বকেয়া রয়েছে। আগামীতে এই শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।
এদিকে, যেখানে-সেখানে বিপুল পরিমাণ পশুর চামড়া ফেলে রাখায় তীব্র পরিবেশদূষণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পচনশীল এসব চামড়া থেকে নির্গত দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, পাশাপাশি ছড়াচ্ছে নানাবিধ জীবাণু। পরিবেশকর্মী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে ‘মরণফাঁদ’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফ এম মান্নান কবীর জানান, চামড়া একটি জাতীয় সম্পদ। এভাবে চামড়া অবিক্রিত থেকে নষ্ট হওয়া বা মাটিতে পুঁতে ফেলা অত্যন্ত দুঃখজনক। চামড়া সংরক্ষণের জন্য স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে আড়তদারদের সমন্বয় করা জরুরি।
কোরবানির সময় কাঁচা চামড়ার সরবরাহ থাকে প্রচুর, কিন্তু তারপরও চাহিদা না থাকার কারণেই মূলত দাম বাড়ে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইন্সটিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, পুরো বিষয়টি নির্ভর করে চাহিদার ওপর। এখন বাজারে যদি চাহিদা না থাকে, তাহলে দাম কীভাবে বাড়বে? যথাযথ দামে শিল্প মালিকরা বিক্রি করতে না পারলে তারা কেন চামড়া কিনবে?
তিনি আরও বলেন, যখন সাভারের হেমায়েতপুরে প্রথমে ট্যানারি স্থাপন হয়, তখন শুরু থেকেই নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুল ছিল। এই নীতিগত কারণেই পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তন হচ্ছে না। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির পর থেকে বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানি কমছে। সেই সঙ্গে কমছে রপ্তানি আয়ও।
এ প্রসঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, সাভারে ট্যানারি স্থাপনের প্রক্রিয়া সঠিকভাবে না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান রুগ্ন হয়ে পড়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি যে সক্ষমতায় থাকার কথা ছিল, তা পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করছে না। ফলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানই মাঝপথে হারিয়ে গেছে। সরকার নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে চামড়া শিল্পে পুনরায় সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহিন আহমেদ বলেন, সাভারে মোট ১৪২টি কোম্পানি আছে। এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটিও মানদণ্ড (কমপ্লায়েন্স) পূরণ করতে পারেনি। যে কারণে রপ্তানি বাড়ছে না। ফলে ইউরোপ-আমেরিকাসহ পাশ্চাত্য দেশগুলো আমাদের এখান থেকে পণ্য কিনছে না।


