দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে মন্ত্রিপরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়ে গেছে নবম পে-স্কেল। চলতি সপ্তাহেই এই পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি।
তিনি আরও বলেছেন, প্রজ্ঞাপন একটি নয়, এ-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি প্রজ্ঞাপন জারি হবে। পাশাপাশি আইনগত ভেটিং শেষে কয়েকটি বিষয় এসআরও আকারেও জারি করা হবে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য দেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন কবে নাগাদ জারি হতে পারে— সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এই সপ্তাহেই হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ। গেজেট একটা না, বেশ কয়েকটা হবে।
তিনি বলেন, সর্বশেষ ২০১৫ সালে জাতীয় বেতন স্কেল দেওয়া হয়েছিল। এরপর প্রায় ১২ বছর ধরে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল হয়নি। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো সময়োপযোগী করতে জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ গঠন করা হয়। কমিশনের প্রতিবেদন পাওয়ার পরও সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে আটটি বৈঠক করা হয়েছে।
নাসিমুল গণি আরও বলেন, ১২ বছর ধরে বেতন বৃদ্ধি ঘটেনি। ৫ বছর অন্তর যেখানে পে স্কেল চেঞ্জ হয়, সেখানে এটা ১২ বছরে হয়নি। তো তাদের জন্যও এটা খুব কষ্টকর এবং জীবনযাত্রার মানও কমে গেছে অনেক। সেটিকে বিবেচনায় রেখে একটা ব্যালান্স করে, এই উভয় দিকে ব্যালান্স করে যেটুকু করা যায় সেটাই করা হয়েছে।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে চলতি ২০২৬-২৭ ও আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে মূল বেতন মোট তিন ধাপে কার্যকর হবে। এরপর ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ভাতাসমূহ একযোগে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিন ধাপের সুনির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাহলে হয়তো ৬ মাসের একটা প্রথমের থেকে চলে যাবে, এই জুলাই থেকে ইফেক্টিভভাবে। ৬ মাস পরে যে আরেকটা ইফেক্টিভ হবে, আর লাস্টে যেয়ে আরেকটা ইফেক্টিভ হবে।
নাসিমুল গণি আরও বলেন, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তিন ধাপে বেতন বাস্তবায়ন হয়ে যাবে এবং ২০২৮ সাল থেকে বেতন-ভাতাসহ পূর্ণ সুবিধা কার্যকর হবে।
নিম্ন গ্রেডে বেতন বেশি বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে। এতে কম আয়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি কিছুটা সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়েছে।
নতুন বেতন স্কেলে পুরোনো পেনশনভোগীদের জন্যও স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৮ হাজার টাকা করা হবে। এছাড়া, ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া ব্যক্তিদের ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকা বা তার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ হারে পেনশন বাড়ানো হবে।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ধীরে ধীরে ‘ওয়ান র্যাঙ্ক, ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। পুরো বেতন স্কেল বাস্তবায়িত হলে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে নাসিমুল গণি জানান, এ অর্থ একসঙ্গে প্রয়োজন হবে না, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কারণে আগামী দুই বছরে পুরো অর্থের প্রয়োজন পড়বে না।
বেতন বাড়ানোর ফলে বাজার ও মূল্যস্ফীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, সে বিষয়টিও সরকার বিবেচনায় নিয়েছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি বলেন, সমস্ত কিছুই অ্যাকাউন্টে নেওয়া হয়েছে। তা না হলে তো একসাথেই টাকা দেওয়া হতো।
বেতন বৃদ্ধির কারণে বাজারে যে প্রভাব পড়বে, সরকার কীভাবে তা মোকাবিলা করবে— এমন প্রশ্নের উত্তরে নাসিমুল গণি বলেন, দেখা যাক কীভাবে হ্যান্ডেল করে গভমেন্ট। সরকারি কর্মচারীদের হাতে অর্থ গেলে তারা অতিরিক্ত পণ্য ও সেবা কিনবেন এবং এর ফলে অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়বে।
নতুন বেতন স্কেলে প্রায় পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত হবেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারছি না। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।
এরপর সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নতুন পে স্কেল আসার পর এ বিষয়টির ‘গতিবেগ বাড়বে’। এটি আর আগের মতো পড়ে থাকতে পারবে না।
এছাড়া, বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন-ভাতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও সরকারের আলোচনায় এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, যারা বেতন স্কেলের ওপর নির্ভরশীল, তাদের বেতন বৃদ্ধি জরুরি। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


