নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রিকুইজিশন করছে। তবে যানবাহন মালিকদের অভিযোগ, তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা অনুমতি ছাড়া রাস্তায় গাড়ি আটকিয়ে জোর করে রিকুইজিশন স্লিপ ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে বিপাকে পড়ছেন চালক ও মালিকরা।
দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এ উপলক্ষে এর মধ্যেই প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর প্রায় ১০ লাখ সদস্য। এত বিশালসংখ্যক সদস্যের চলাচলের জন্য নিজস্ব গাড়ির বাইরে সরকারি ও বেসরকারি গাড়ি রিকুইজিশনের জন্য ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগকে নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
তবে অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনে চার দিনের ছুটিতে অনেক সরকারি গাড়ি অব্যবহৃত থাকলেও রিকুইজিশন করা হচ্ছে ব্যক্তিগত গাড়ি। ব্যক্তিগত গাড়ি চালকরা বলছেন, রিকুইজিশনের আওতায় পড়ব কিনা, এরকম একটা ভয় কাজ করছে। এটা খুব কষ্টকর। আমার নিজের প্রাইভেট গাড়ি। যদি এটা রিকুইজিশনে পড়ে, তাহলে আমার জন্য সমস্যা হবে।
একই চিত্র গণপরিবহনের ক্ষেত্রেও। রাজধানীর আজিমপুর থেকে গাজীপুরগামী ভিআইপি পরিবহনের এক মালিকের দুইটি গাড়িও রিকুইজিশনে নেয়া হয়েছে। মালিক অভিযোগ করেছেন, ট্রাফিক পুলিশ তাকে জানানোর প্রয়োজনই মনে করেনি, সরাসরি রাস্তায় গাড়ি আটকিয়ে স্লিপ ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। কাগজপত্র জব্দ করে রাখা হচ্ছে। এটার ক্ষতিপূরণ দেবে কে? এটা জানা দরকার। না হলে আমার পরিবারসহ চলতে হবে কঠিন পরিস্থিতিতে।
ভিআইপির মতো আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে চলাচল করা বেশিরভাগ পরিবহনের গাড়িও রিকুইজিশনের আওতায় পড়েছে। মালিক, চালক বা সহকারীরাও জানেন না, তারা কি খাবার খরচ পাবেন কিনা।
পরিবহন স্টাফরা বলেন, রাস্তায় হঠাৎ সিগন্যাল দিয়ে গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র নিয়ে গেছে, লাইসেন্সও নিয়েছে এবং একটি রিকুইজিশন স্লিপ ধরিয়ে দিয়েছে। স্লিপ অনুযায়ী গাড়ি দিতে হবে। কিন্তু গাড়িতে থাকা তিনজনের বেতন বা চলার খরচের ন্যূনতম অংশটুকু সরকার দেয়নি। ভোর থেকে কাজ শুরু করতে হবে, ভোট দিতে পারব না। সরকারকে এটা বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বলছে, অন্যান্য নির্বাচনের সময় রিকুইজিশনের আগে সমিতির সঙ্গে আলোচনা করা হতো। কিন্তু এবার কিছুই করা হয়নি। সংগঠনটির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, এবার পুরো ব্যাপারটাই ব্যত্যয় হয়েছে। কোনো রেসপন্স বা লিখিত উত্তর দেয়া হয়নি। আমরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, নির্বাচন কমিশনের সচিব ও কমিশনারদের লিখিত চিঠি দিয়েছি, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ এবং আইজিপিকেও জানিয়েছি। তাতেও কোনো সাড়া পাইনি।
তবে ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঢালাওভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশন করা হয়নি; সরকারি গাড়িও রিকুইজিশনের আওতায় রয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, রিকুইজিশনের নিয়ম প্রচলিত আছে। হিসাব রাখা হচ্ছে, হিসাব শেষে আমরা চেষ্টা করব প্রতিটি রিকুইজিশন গাড়ির মালিককে কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়ার। কতটা সম্ভব হবে বা কত টাকা দেয়া যাবে, সেটা এখন বলা যাচ্ছে না।
পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে থেকেই সিস্টেম তৈরি না করে গাড়ি রিকুইজিশন করা ঠিক হয়নি। রিকুইজিশনকৃত গাড়ি যাতে সঠিক ক্ষতিপূরণ পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বুয়েট এক্সসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, চালক ও মালিকরা গাড়ির খরচ ঠিকমতো পাচ্ছেন না। অনেক সময় গাড়ি তিন থেকে সাত দিনের বেশি রাখা হচ্ছে, অথচ অর্থ পাননি। রিকুইজিশনকে আতঙ্কের কারণ বানানো হয়েছে। হওয়া উচিত ছিল, একটি স্ট্যান্ডার্ড সিস্টেম তৈরি করা যাতে মালিক ও চালক কতদিন গাড়ি দিবে, কত ভাড়া পাবে তা আগে নির্ধারিত থাকে।
এদিকে, ভবিষ্যতে রিকুইজিশনের যানবাহন মালিকদের উৎসাহী করতে ক্ষতিপূরণের টাকা বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


