শুক্রবার (১৫ মে) দুপুরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড পূর্বচর পাড়াতলা এলাকায় ঘটে এমন হৃদয়বিদারক ও পৈশাচিক ঘটনা। নিহত আনোয়ার হোসেন (৩৫) ওই এলাকার মৃত সাফি উদ্দিনের ছেলে। অভিযুক্ত মরম আলী তার আপন চাচা।
ঘটনার ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে থাকা আনোয়ার নড়াচড়া করছেন, কিন্তু আশপাশে থাকা লোকজন কেউ তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসছেন না। এমন দৃশ্য ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (১৬ মে) কটিয়াদী মডেল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নিহতের মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে শুক্রবার রাতেই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তার চাচা মরম আলীর জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিস-বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, সম্প্রতি তুচ্ছ বিষয় নিয়েও উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল।
শুক্রবার দুপুরে বাড়ি ফাঁকা থাকার সুযোগে মরম আলী ও তার লোকজন আনোয়ারের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা। ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তাকে গুরুতর জখম করা হয়। পরে তাকে স্থানীয় চটান পূর্বচর পাড়াতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের বারান্দা ও মাঠসংলগ্ন স্থানে ফেলে রাখা হয়।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, হামলার পর অভিযুক্তদের ভয়ে কেউ আনোয়ারের কাছে যেতে সাহস পাননি। অনেকেই দূর থেকে তাকিয়ে ছিলেন। কেউ কেউ ভিডিও ধারণ করলেও তাকে হাসপাতালে নেয়ার উদ্যোগ নেননি। দীর্ঘ সময় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আনোয়ারকে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়। পরে সুরতহাল শেষে মরদেহ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত মরম আলী ও তার ছেলেরা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, নিহত আনোয়ারের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা ও চুরিসহ বিভিন্ন অভিযোগ ছিল। এসব কারণে অনেকেই তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। তবে তারা বলেন, ‘কোনো অপরাধের বিচার এভাবে হতে পারে না। মানুষকে এভাবে কষ্ট দিয়ে মারা অমানবিক। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই।’
নিহত আনোয়ারের মা শিরিনা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা দুপুরে বাড়িতে ছিলাম না। সেই সুযোগে মরম আলী তার ছেলেদের নিয়ে বাড়িতে ঢুকে আমার ছেলেকে অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। পরে তাকে ঘরের ভেতরে আটকে রাখে। এরপর স্কুলের বারান্দায় ফেলে রেখে যায়। তখনও আমার ছেলে জীবিত ছিল। দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারলে হয়তো বাঁচানো যেত। আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।’
নিহতের বোন সালমা আক্তার বলেন, ‘বাড়ি ফাঁকা পেয়ে পরিকল্পনা করেই আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। তারা আমার ভাইকে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে সময়ক্ষেপণ করেছে। তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমরা এই হত্যার বিচার চাই।’
বিদেশে থাকা নিহতের ভাই সজল বলেন, ‘আমার ভাইকে খুব নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। দুই পায়ের রগ পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। অনেক যন্ত্রণা নিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।’
কটিয়াদী মডেল থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। নিহতের মা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন। আমরা গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছি। জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
এ ঘটনায় শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, আহত একজন মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে না আসার বিষয়টিও স্থানীয়দের মধ্যে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে। মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও আইনগত সচেতনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে এলাকাজুড়ে।


