জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল যেন নিজেই ক্যান্সারে আক্রান্ত। এখানে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অথচ ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে মাত্র দুই মাসের মধ্যেই থেরাপির ব্যবস্থা করে দিচ্ছে একটি চক্র। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য থাকা অধিকাংশ মেশিনই বর্তমানে অকেজো। ফলে চিকিৎসকরা বাধ্য হয়ে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা পদ্ধতি পরিবর্তন করছেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে গিয়ে চিকিৎসা শুরুর আগেই প্রাণ হারাচ্ছেন হাজারো ক্যান্সার রোগী।
দেশে সরকারিভাবে ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রধান ভরসা রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। কিন্তু এখানে রেডিওথেরাপির ছয়টি মেশিনের মধ্যে চারটিই অকেজো। মাত্র দুটি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন দুই শতাধিক রোগীকে থেরাপি দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার রোগী অপেক্ষমাণ রয়েছেন।
পিত্তথলির ক্যান্সারে আক্রান্ত পারভীন খাতুন বর্তমানে ক্যান্সারের দ্বিতীয় পর্যায়ে আছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, তার দ্রুত রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে তাকে রেডিওথেরাপির জন্য সিরিয়াল দেয়া হয়েছে ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। প্রশ্ন হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত তার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কতটুকু?
গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, অধিকাংশ রোগী হাসপাতালে আসেন শেষ পর্যায়ে। ফলে এক থেকে দেড় বছর পর সিরিয়াল পাওয়া আর না পাওয়ার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। কারণ এই দীর্ঘ অপেক্ষার সময় ক্যান্সার আরও ছড়িয়ে পড়ে। এতে দীর্ঘ সিরিয়ালের কারণে অনেক রোগী চিকিৎসা শুরুর আগেই মারা যান। রোগীর চাপ অনেক বেশি হলেও হাসপাতালে কার্যকর রয়েছে মাত্র দুটি মেশিন। হাসপাতালে অন্তত আটটি মেশিন প্রয়োজন।
এদিকে, সঠিক সময়ে রেডিওথেরাপি দেয়া সম্ভব না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা পদ্ধতিও পরিবর্তন করতে হচ্ছে। যার সুফল নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিওতে এক কর্মকর্তা জানান, রেডিওথেরাপি না পেয়ে অনেক রোগী ও স্বজন ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। তারা অভিযোগ করেন, সরকারি হাসপাতালে এসে চিকিৎসা না পেয়ে বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এজন্য অনেক রোগীকে তিন থেকে চার সাইকেল কেমোথেরাপি দেয়া হয়, যাতে প্রায় তিন মাস সময় লাগে। তবে এতে খুব বেশি সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
চিকিৎসক, নার্স থেকে শুরু করে থেরাপি টেকনোলজিস্ট-সবারই জানা, এক বছর রেডিওথেরাপির জন্য অপেক্ষা করা মানে একজন রোগীকে মৃত্যুর আরও কাছাকাছি ঠেলে দেয়া। কিন্তু তারাও পরিস্থিতির কাছে অসহায়। তবে এই সুযোগে একটি দালালচক্র টাকার বিনিময়ে দুই মাসের মধ্যেই রেডিওথেরাপির সময়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।
হাসপাতালেই দালালচক্রের সঙ্গে পরিচয় হয় মাদ্রাসাছাত্র বেলালের। তিনি জানান, ৩০ হাজার টাকা দিয়ে সাত মাস এগিয়ে চলতি মাসেই রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেয়েছেন।
সময়ের অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু বেলাল নন, ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দিলেই এই চক্র দুই মাসের মধ্যে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল নিশ্চিত করে দেয়। রোগীর স্বজন পরিচয়ে কথা বললে চক্রের এক সদস্য জানান, টাকা দিলে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই থেরাপির ব্যবস্থা করা সম্ভব।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আসমা সিদ্দিকা বলেন, সরকারি খাতের প্রায় সব জায়গাতেই দালাল থাকে। তবে এই হাসপাতালে দালালদের সম্পৃক্ততার সুযোগ খুবই সীমিত।
ডা. আসমা সিদ্দিকা চিকিৎসা ব্যবস্থার দুরবস্থার জন্য লোকবল ও মেশিন সংকটকে দায়ী করেন। তার মতে, অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারেন না। কেউ মারা যান, কারও রোগ জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়, আবার কেউ চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসকদের করার মতো তেমন কিছু থাকে না। এ সংকট কাটাতে আরও বেশি সংখ্যক মেশিন স্থাপন করতে হবে।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটে দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে থাকা রেডিওথেরাপি মেশিনগুলো যেন দেশের ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যবস্থার সামগ্রিক দুরবস্থার প্রতিচ্ছবি। দ্রুত এসব মেশিন মেরামত বা নতুন মেশিন স্থাপন করা না গেলে হাজারো ক্যান্সার রোগী চিকিৎসার সুযোগ না পেয়েই মৃত্যুর মুখে পড়বেন।


