ব্যাপক বিরোধিতার মুখে দ্রুতই পিছু হঠতে বাধ্য হলো ফিফা। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো জানিয়ে দিলেন, বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বিক্রির পরিকল্পনা বাতিল করেছে তারা।
ফিফার পরিকল্পনা ছিল, বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন ইভেন্ট পরিচালনার জন্য একটি নতুন সংস্থার প্রায় ২০ শতাংশ অংশীদারিত্ব বিক্রি করে ৪.২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত তহবিল সংগ্রহ করা।
মঙ্গলবার এই প্রস্তাবটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে চারপাশ থেকে। উয়েফা অভিযোগ তোলে, খেলাটির ‘আত্মা বিক্রি’ করে দিচ্ছি ফিফা। বিশ্বকাপসহ ফিফার সব আসর বর্জনের হুমকি দেয় ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এছাড়াও কনক্যাকাফ, এশিয়া অঞ্চলও এটির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এমনকি এই পরিককল্পনার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন ফিফা সভাপতির সিনিয়র উপদেষ্টাও।
ফিফার পক্ষ থেকে যদিও বৃহস্পতিবার জোর দিয়েই বলা হয়েছিল, বিরোধিতা সত্ত্বেও তারা এই প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনা প্রক্রিয়া এগিয়ে নেবে। তবে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে শুক্রবার বিবৃতি দেন ইনফান্তিনো।
তিনি বলেন, সকল মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনার পর এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, এই প্রকল্পটি এমন ধরনের বিভেদ তৈরি করেছে যা সমর্থনের মাত্রা নির্বিশেষে, প্রথমত নির্ধারিত লক্ষ্যের আর স্বার্থে নেই। আমাদের উদ্দেশ্য সর্বদা ছিল – এবং থাকবে – ঐক্যবদ্ধ করা এবং উন্নতি করা। ফলস্বরূপ, এই প্রস্তাবটি আর এগোবে না।
ফিফা যুক্তি দিয়েছিল যে, তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মাইনোরিটি অংশ বিক্রি করে বৈশ্বিক ক্রীড়া উন্নয়নে অর্থায়নের জন্য শত শত কোটি ডলার সংগ্রহ করা যাবে। প্রস্তাবটিকে ভুলভাবে উপস্থাপনের জন্য গণমাধ্যমকে অভিযুক্ত করেছিল তারা।
ইনফান্তিনো সদস্য সংগঠনগুলোকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন যে, ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিফার প্রস্তাবে রাজি হলে তারা প্রত্যেকে ৪ কোটির ডলার করে পাবে।
কিন্তু সেই আহবানে সাড়া না পেয়ে ইনফান্তিনো এখন ঐক্যের ডাক দিচ্ছেন।
ইনফান্তিনো বলেন, আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে আমাদের খেলার প্রতি অভিন্ন আগ্রহের চেতনায় সকল আগ্রহী পক্ষকে পুনরায় একত্রিত করাই আমার উদ্দেশ্য, এবং এর লক্ষ্য হলো সর্বত্র ফুটবলের প্রসার অব্যাহত রাখা, বিশেষ করে সেই দেশগুলোতে, যেখানে আমাদের সমর্থন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
মঙ্গলবার প্রস্তাবটি প্রকাশের পর তাৎক্ষণিক তীব্র প্রতিবাদ জানায় ফিফা। পরে ক্রমে ফুটবল বিশ্বজুড়ে বিরোধিতা তীব্রতর হতে থাকে।
উয়েফার ৫৫টি সদস্য রাষ্ট্র বৃহস্পতিবার সর্বসম্মতিক্রমে জানায়, প্রস্তাবটি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ফিফার সমস্ত টুর্নামেন্ট বর্জন করবে তারা। কড়া প্রতিক্রিয়ায় সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, বিনিয়োগ পণ্য হিসেবে গণ্য করা যায় না।
উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ৪১-সদস্যের ফেডারেশন কনকাকাফ বৃহস্পতিবারের এক বৈঠকে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে।
৪৭ সদস্যের এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন বিবৃতিতে জানায় যে, তারা উয়েফা এবং কনক্যাকাফের সঙ্গে ‘একাত্মতা প্রকাশ করছে।’
উয়েফা, কনক্যাকাফ এবং এএফসির সম্মিলিত জাতীয় সংস্থা ১৪৩টি, যা ফিফার ২১১টি সদস্যের অর্ধেকেরও বেশি। পরিকল্পনাটি কার্যকর হওয়ার জন্য সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সমর্থনে ভোট দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কাজেই ভোটের লড়াইয়ে সম্ভাব্য ছবিটি দেখতে পাচ্ছিলেন ইনফান্তিনো।
ফিফায় অভ্যন্তরীণভাবেও মতবিরোধ ছিল। ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস করডেরো এই পরিকল্পনাকে “ফুটবলের জন্য একটি খারাপ চুক্তি” অভিহিত করে পদত্যাগ করেন। ফিফার প্রধান পরিচলন কর্মকর্তা কেভিন লামুখ এই প্রস্তাবটিকে বর্ণনা করেন ‘একজন ব্যক্তির প্রকল্প’ হিসেবে এবং স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, কর্মীদের ‘প্রতারণা’ করেছেন ইনফান্তিনো এবং ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনো আগামী বছর পুনর্নির্বাচনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। উত্তর আমেরিকার ফুটবল প্রধান ভিক্টর মন্টালিয়ানি তাকে চ্যালেঞ্জ করবেন বলে গুঞ্জন আছে।
শুরুর দিকে যারা প্রতিবাদ করেছেন, তাদের একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ফিফা নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ‘ভুল ব্যক্তি’ ইনফান্তিনো।
ফিফা বিশ্বকাপ এবং এর অন্যান্য ইভেন্টগুলো পরিচালনার জন্য ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) নামে ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি সহায়ক সংস্থা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিল।
ফিফার তথ্য অনুযায়ী, জশুয়া কুশনারের প্রতিষ্ঠিত থ্রাইভ ক্যাপিটাল পরিচালিত একটি তহবিল, থ্রাইভ ইটার্নাল, প্রস্তাবিত বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। জশুয়া হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই।
ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, যেটির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক ছিল। ট্রাম্প যদিও দাবি করেছেন, বাইরের বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে ইনফান্তিনোর সঙ্গে কথা বলেননি তিনি।


