সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২৬
সোমবার, জুলাই ২৭, ২০২৬
29.5 C
Dhaka
Homeজেলার খবর“ধর্ম নয়, ঘৃণার অপব্যাখ্যাই বিশ্বকে রক্তাক্ত করছে” শাহসুফি ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ...

“ধর্ম নয়, ঘৃণার অপব্যাখ্যাই বিশ্বকে রক্তাক্ত করছে” শাহসুফি ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারী

প্রকাশ: জুলাই ২৭, ২০২৬ ৭:২৩

ধর্মের নামে বিভাজন, উগ্রবাদ ও সহিংসতার বিপরীতে প্রেম, সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধকে বিশ্বশান্তির একমাত্র টেকসই ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় নেতা, গবেষক, নীতিনির্ধারক ও কমিউনিটি ব্যক্তিত্বরা। একই সঙ্গে ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ঘৃণা, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাস ছড়ানো চরমপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈশ্বিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ফিলিস্তিনের গাজাসহ বিশ্বের যেখানেই নিরীহ মানুষের ওপর যুদ্ধ, দখলদারিত্ব, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অমানবিকতা চলছে, তা বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান বক্তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ব্রুকলিনে ৭৮৬ কোনি আইল্যান্ড অ্যাভিনিউস্থ ‘জালসা’ কনভেনশন হলে শনিবার (২৫ জুলাই) ‘লাভ অ্যান্ড মার্সি—দ্য মেসেজ অব অল দ্য প্রফেটস (আ.)’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে বক্তব্যে একথা উঠে আসে। বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলা এ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, শিক্ষাবিদ, গবেষক, আন্তঃধর্মীয় সংলাপের প্রতিনিধি, কমিউনিটি নেতা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নেন।

সম্মেলনের প্রধান অতিথি ছিলেন আওলাদে রাসূল (ﷺ), সাজ্জাদানশীন-এ দরবারে গাউছুল আযম মাইজভাণ্ডারী এবং সুফি ইউনিটি ফর ইন্টারন্যাশনাল সলিডারিটি (SUIS)-এর প্রেসিডেন্ট হযরত শাহসুফি ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী আল-মাইজভাণ্ডারী (মা.জি.আ.)।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাহসুফি ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী আল-মাইজভাণ্ডারী বলেন, “আল্লাহর সকল নবী ও রাসূল (আ.) মানবজাতিকে ভালোবাসা, ন্যায়বিচার, দয়া, সহনশীলতা ও মানবকল্যাণের শিক্ষা দিয়েছেন। অথচ আজ কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী ধর্মের অপব্যাখ্যা করে ঘৃণা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ধর্ম নয়, ঘৃণার অপব্যাখ্যাই আজ বিশ্বকে রক্তাক্ত করছে। এটি শুধু ধর্মের নয়, সমগ্র মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এদের মোকাবিলায় আলেম-ওলামা, ধর্মীয় নেতা, রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং শান্তিকামী মানুষকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।”

তিনি বলেন, “ফিলিস্তিনের গাজায় নারী, শিশু ও নিরীহ মানুষের ওপর চলমান মানবিক বিপর্যয় সমগ্র বিবেকবান বিশ্বের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। একইভাবে বিশ্বের যেখানেই যুদ্ধ, দখলদারিত্ব, বর্ণবিদ্বেষ, ধর্মীয় নিপীড়ন কিংবা নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত ঘটছে, সেখানেই মানবতার পক্ষে সোচ্চার হওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কোনো নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানি কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”

তিনি আরও বলেন, “সভ্যতার ভবিষ্যৎ অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় নয়; বরং ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সম্মান, সংলাপ এবং মানবিক সহযোগিতার মধ্যেই নিহিত। বিশ্বনেতাদের উচিত সংঘাত নয়, শান্তি প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া।”

গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট-এর প্রেসিডেন্ট ড. আহমদ মুহিউদ্দীন (জনাথন গ্র্যানফ) বলেন, “নিরাপত্তা শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে নিশ্চিত হয় না। স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন নৈতিক নেতৃত্ব, আন্তঃধর্মীয় সহযোগিতা, মানবাধিকার রক্ষা এবং পারস্পরিক আস্থা।” তিনি সংঘাত নিরসনে ধর্মীয় নেতা, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ইসলামিক ফোরাম অব কানাডা-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট শায়খ ফয়সাল হামিদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “ইসলামের প্রকৃত পরিচয় রহমত, ভারসাম্য ও মানবসেবা। যারা ইসলামের নামে উগ্রবাদ ও সহিংসতা ছড়ায়, তারা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বিচ্যুত।” তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এর দয়া, সহমর্মিতা ও শান্তির আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত ইউএসএ-এর প্রেসিডেন্ট আল্লামা সৈয়দ জুবায়ের আহমদ বলেন, “ধর্ম কখনো মানুষকে বিভক্ত করার জন্য নয়; বরং সত্য, ন্যায় ও শান্তির পথে একত্রিত করার জন্য। উগ্রবাদ প্রতিরোধে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক সঠিক জ্ঞান, সচেতনতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ জরুরি।”

মইনীয়া যুব ফোরামের সাবেক প্রেসিডেন্ট শাহজাদা সৈয়দ মেহবুব-এ মইনুদ্দীন আল-হাসানী তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ, নৈতিক নেতৃত্ব ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির কোনো বিকল্প নেই। তিনি ধর্মের নামে ঘৃণা ও সহিংসতার অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং বলেন, তরুণ প্রজন্মকে মানবসেবা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চেতনায় গড়ে তুলতে পারলেই একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির বিশ্ব বিনির্মাণ সম্ভব হবে।”

মইনীয়া যুব ফোরাম-এর প্রেসিডেন্ট ও তরুণ ইসলামিক সুফি স্কলার শাহজাদা শায়খ সৈয়দ মাশুক মইনুদ্দীন আল-হাসানী বলেন, “তরুণ প্রজন্মকে ভালোবাসা, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও মানবসেবার আদর্শে গড়ে তুলতে পারলে উগ্রবাদ ও ঘৃণার রাজনীতি কখনোই তাদের আকৃষ্ট করতে পারবে না। শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।”

সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট ইসলামী বক্তা শায়খা মারইয়াম কবীর, নিউইয়র্ক আহলুল বাইত মসজিদের খতিব আল্লামা সৈয়দ মুতাওয়াক্কিল বিল্লাহ রাব্বানী বদরপুরী, আমেরিকান মুসলিম অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্ক-এর চেয়ারম্যান মুফতি সাজ্জাদ রেযা, জেবিবিএ (জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশ বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন)-এর সভাপতি গিয়াস আহমেদ, ওয়েস্টার্ন মিশিগান ইউনিভার্সিটি-এর পিএইচডি গবেষক শায়খ আজমাইন আসরার মাইজভাণ্ডারী, নিউ জার্সি বিলাল মসজিদ-এর খতিব মাওলানা বিলাল খান, ইয়ুথ ফোরাম অব ওমান-এর প্রেসিডেন্ট সৈয়দ হামজা শাহ, আন্তঃধর্মীয় নেতা, লেখক ও শিক্ষাবিদ মাইকেল শেরাক, বাংলাদেশ মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ব্রুকলিন-এর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ লুৎফুল করিম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন ইউএসএ-এর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ শামসুদ্দীন আজাদ, বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকরপোরেটেড-এর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন, খাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রহ.)-এর চিশতিয়া তরিকার প্রতিনিধি মোহাম্মদ কাসিম মাজিদ এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত ইউএসএ-এর সেক্রেটারি জেনারেল আলহাজ মোহাম্মদ সলিম উদ্দিন।

অনুষ্ঠানের সূচনায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্বারী মুহাম্মদ ফারুক এবং ক্বারী সৈয়দ মুস্তানজিদ বিল্লাহ রাব্বানী পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করেন।

সম্মেলনের শেষপর্বে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি, ফিলিস্তিনের নিপীড়িত জনগণের নিরাপত্তা এবং সমগ্র বিশ্বমানবতার কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মুনাজাত পরিচালনা করেন হযরত শাহসুফি ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ আল-হাসানী আল-মাইজভাণ্ডারী (মা.)।

সম্মেলনে আগত বক্তারা বলেন, ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে বিভক্ত নয়, ঐক্যবদ্ধ করে। তাই বিশ্বজুড়ে চরমপন্থা, ঘৃণা, সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় ধর্মীয় সম্প্রীতি, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ বৈশ্বিক উদ্যোগ গড়ে তোলার এখনই সময়।

সম্মেলনে বক্তারা আরও বলেন, শান্তি কোনো একক ধর্ম, জাতি বা রাষ্ট্রের এজেন্ডা নয়; এটি সমগ্র মানবজাতির অভিন্ন দায়িত্ব। তাই ঘৃণা, উগ্রবাদ ও সহিংসতার পরিবর্তে ভালোবাসা, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা এবং মানবিক মর্যাদার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বের একমাত্র টেকসই পথ।

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় খবর