ডাল খাওয়ার পর পেটে অস্বস্তি বা গ্যাস হওয়ার পেছনে রয়েছে অন্য কারণ। ডালের এই ফেনা আসলে কী, এটি শরীরে কেমন প্রভাব ফেলে সে নিয়ে চিকিৎসকরা কথা বলেছেন।
ডাল দক্ষিণ এশিয়ার ঘরে ঘরে একটি পরিচিত ও পুষ্টিকর খাবার। বিভিন্ন ধরনের ডাল দিয়ে প্রতিদিনের নানা পদ তৈরি হয়। তবে ডাল খেলে অনেকের পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হয় এমন ধারণা থেকে কেউ কেউ এটি এড়িয়ে চলেন। ভারতের রায়পুরের অনকোলজিস্ট ডা. জয়েশ শর্মা সম্প্রতি একটি ভিডিওতে এসব ভুল ধারণা ভেঙে ব্যাখ্যা দেন। তিনি প্রথমে ডাল রান্নার সময় উপরে যে ফেনা তৈরি হয়, সেটি নিয়ে কথা বলেন।
ডালের উপরের ফেনা কী
ডাল ফুটতে শুরু করলে উপরে হালকা ফেনার মতো স্তর দেখা যায়। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। মূলত ডালের প্রোটিন ও স্টার্চ গরম পানির সংস্পর্শে এসে এই ফেনা তৈরি করে। ডাল গরম হলে প্রোটিনের গঠন বদলে যায় এবং তা বাতাস আটকে বুদবুদ তৈরি করে উপরে উঠে আসে। পাশাপাশি স্টার্চও আলগা হয়ে ফেনাটিকে ঘন করে।
এই ফেনা কি ক্ষতিকর?
অনেকে মনে করেন এই ফেনা বিষাক্ত কিন্তু এটি সঠিক নয়। ডা. জয়েশ শর্মার মতে, এই ফেনায় প্রোটিন ও স্টার্চের পাশাপাশি ‘স্যাপোনিন’ নামের একটি উপাদান থাকে, যা উদ্ভিদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ। স্বল্প পরিমাণে স্যাপোনিন শরীরের জন্য উপকারী এতে প্রদাহ কমানোর এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়ক গুণ রয়েছে। তবে অতিরিক্ত ফেনা ডালের স্বাদ তিতা করে দিতে পারে এবং বেশি পরিমাণে খেলে অন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যাদের আইবিএস (ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম) আছে, তাদের ক্ষেত্রে সামান্য পরিমাণেও সমস্যা হতে পারে।
ডাল খেলে কেন গ্যাস হয়
এর মূল কারণ হলো ‘ফডম্যাপস’ (FODMAPs)। এগুলো এমন কিছু কার্বোহাইড্রেট, যা ছোট অন্ত্রে ঠিকভাবে হজম হয় না। এর মধ্যে রয়েছে—
ফারমেন্টেবল উপাদান
অলিগোস্যাকারাইড
ডাইস্যাকারাইড
মনোস্যাকারাইড
পলিওল
এই উপাদানগুলো অন্ত্রে পৌঁছে ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ফারমেন্ট হয়, যার ফলে গ্যাস, পেট ফাঁপা, ব্যথা ও অস্বস্তি তৈরি হয়।
ডালে প্রাকৃতিকভাবে গ্যালাক্টো-অলিগোস্যাকারাইড থাকে, যা এক ধরনের ফডম্যাপ। আমাদের শরীরে এটি ভাঙার প্রয়োজনীয় এনজাইম কম থাকে, তাই এটি সরাসরি অন্ত্রে গিয়ে ফারমেন্ট হয় এবং সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে ডাল ক্ষতিকর। শুধু কিছু মানুষের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে হজমে কঠিন, বিশেষ করে বেশি পরিমাণে বা ঠিকমতো না রান্না করলে।
ডাল সহজপাচ্য করার উপায়
ডা. জয়েশ শর্মার মতে, ডাল ভালোভাবে রান্না করলে এসব সমস্যা অনেকটাই কমে যায়। ফেনা ফেলে দেয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো
ভালোভাবে ধোয়া
ভিজিয়ে রাখা
ঠিকভাবে রান্না করা
ডাল ভিজিয়ে রেখে সেই পানি ফেলে দিলে কিছু ফডম্যাপ বের হয়ে যায়। এতে গ্যাস হওয়ার সম্ভাবনা কমে। পাশাপাশি অতিরিক্ত স্টার্চ ও ময়লাও দূর হয়। ফলে ভেজানো ডাল কম ফেনা তৈরি করে এবং স্বাদও হালকা হয়।
প্রেসার কুকারে উচ্চ তাপে দ্রুত রান্না হওয়ায় ফডম্যাপ ও স্যাপোনিন ভেঙে যায়। এতে পানি কম লাগে, ফলে পুষ্টিগুণও বেশি থাকে। ভিজিয়ে রাখা ও প্রেসার কুকারে রান্না এই দুই প্রক্রিয়া একসঙ্গে ডালকে নরম, সুস্বাদু ও সহজপাচ্য করে।
ডাল খেয়ে অস্বস্তি হলে তার জন্য সাধারণত ডাল দায়ী নয়। বরং ঠিকভাবে না ভিজানো, কম রান্না করা বা অতিরিক্ত খাওয়াই মূল কারণ। মাত্র ২০–৪০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে ভালোভাবে রান্না করলে ডাল সহজেই হজম হয় এ কারণেই এই পদ্ধতি বহুদিন ধরে প্রচলিত।
সূত্র: এনডিটিভি


