রোজা শুধু দিনভর পানাহার থেকে বিরত থেকে ক্ষুধা সহ্য করা নয়। এটি শরীরকে একটু থামার সুযোগ করে দেয়। যেমন একটা মেশিন সারাক্ষণ চললে একসময় গরম হয়, ক্লান্ত হয়ে যায়, ঠিক তেমনই আমাদের শরীরও
সারাদিন খাবার হজম করতে করতে কখনোই পুরো বিশ্রাম পায় না। রমজান মাস সেই বিরল সময়, যখন শরীরকে বলা হয় ‘আজ তুমি একটু নিজের কাজগুলো গুছিয়ে নাও।’
রমজান মাসে রোজা রাখার ফজিলত, তাৎপর্য এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে কম-বেশি সবাই জানেন। কিন্তু রোজার ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিজ্ঞান কী বলে, তা অনেকের কাছেই অজানা। এ ব্যাপারে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পুষ্টিবিদ ফৌজিয়া আহমেদ অনু।
- রমজানে পানাহার থেকে বিরতি কী ঘটায় শরীরে:
পুষ্টিবিদ ফৌজিয়া আহমেদ বলেন, দীর্ঘ সময় যখন না খেয়ে থাকা হয়, তখন শরীর শুধু অপেক্ষা করে না। বরং সে নিজের ভেতরে জমে থাকা জিনিসগুলো ব্যবহার করতে শুরু করে। এ সময় জমে থাকা ফ্যাট ব্যবহার হয়, ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো মেরামত হয় এবং অপ্রয়োজনীয় বা দুর্বল কোষগুলো পরিষ্কার হতে শুরু করে।
তিনি জানান, বিজ্ঞানীরা এটাকে বলেন অটোফ্যাজি। এর অর্থ হচ্ছে, শরীরের নিজস্ব পরিষ্কার ও মেরামতের প্রক্রিয়া। ২০১৬ সালে জাপানের বিজ্ঞানী ড. ইয়োশিনোরি ওহসুমি এই প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি দেখান, যখন শরীর দীর্ঘ সময় খাবার পায় না, তখন কোষ নিজের ভেতরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো ভেঙে ফেলে এবং নতুনভাবে গঠন শুরু করে। সহজভাবে বললে, শরীর নিজেই নিজেকে রিফ্রেশ করতে শুরু করে।
- তাহলে রোজা কী করে?
ফৌজিয়া আহমেদ বলেন, রোজা এই প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিকভাবে সক্রিয় হতে সহায়তা করে। রোজা থাকার ফলে শুধু শরীর নয়, মনও বদলে যায়। রোজা ধৈর্য শেখায়, অভ্যাস বদলায় এবং খাওয়ার প্রতি অপ্রয়োজনীয় আকর্ষণ কমায়। একইসঙ্গে হরমোনের ভারসাম্য ঠিক থাকে, ব্লাড সুগার স্থিতিশীল হয়, মস্তিষ্কও নতুনভাবে কাজ করতে শুরু করে। অনেকেই লক্ষ্য করেন, রমজানে মন হালকা লাগে, চিন্তা পরিষ্কার হয়। এটা শুধু আধ্যাত্মিক অনুভূতি নয়, এর পেছনে শারীরিক পরিবর্তনও কাজ করে। - ইবাদত আর উপকার, দুটো একসঙ্গে:
এ পুষ্টিবিদ বলেন, রোজার সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হচ্ছে, আমরা রোজা রাখি মহান আল্লাহকে খুশি করার জন্য। কিন্তু আল্লাহ এমন একটি ইবাদত দিয়েছেন, যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে শরীরের নানা উপকার। যেমন- আত্মা শান্ত হয়, শরীর বিশ্রাম পায়, কোষ মেরামত হয় এবং মেটাবলিজম নতুন করে ভারসাম্য খুঁজে পায়।
তিনি বলেন, রমজান যেমন ইবাদতের অংশ, একইসঙ্গে এটি শরীরের পুনর্জন্মের সুযোগও। রমজান শুধু না খাওয়ার নাম নয়। এটি ভেতর থেকে নতুন হওয়ার সময়। যেখানে আমরা আল্লাহর দিকে ফিরে যাই, আর শরীরও নিজের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ পায়।
পুষ্টিবিদ ফৌজিয়া আহমেদ বলেন, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কতটা মহান। যে আমলটি আমরা যুগের পর যুগ ধরে করে আসছি শুধু ঈমান ও বিশ্বাসের কারণে, অথচ তার ভেতরের জ্ঞান ও উপকারিতা আমরা সবসময় বুঝে উঠতে পারিনি। আমরা জানতাম, এটি ইবাদত। ফলে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা পালন করা হয়। কিন্তু আজ এত বছর পর এসে বিজ্ঞান ধীরে ধীরে সেই রহস্যের কিছুটা উন্মোচন করছে। যে রোজা আমরা পালন করি আত্মিক শুদ্ধতার জন্য, সেটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে শরীরের বিশ্রাম, কোষের মেরামত, মেটাবলিক ভারসাম্য―যা এখন গবেষণাগারে প্রমাণ হচ্ছে।
সবশেষ তিনি বলেন, মজার বিষয় হলো, যা আমরা ইবাদত হিসেবে পালন করে এসেছি, আজ সেটিকেই পাশ্চাত্য বিশ্ব ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ নামে গ্রহণ করছে, যা কেবল শরীরকে সুস্থ রাখার উপায় হিসেবে। তারা আজ শিখছে, যে অভ্যাসটি আমরা বিশ্বাসের কারণে করি, তার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে শরীরের পুনরুজ্জীবনের পথ। এ যেন এক নীরব স্মরণ, আল্লাহ যা নির্দেশ দেন, তার মধ্যে শুধু আখিরাতের কল্যাণ নয়, দুনিয়ার কল্যাণও নিহিত থাকে। রমজান এমন একটি ইবাদত, যা আত্মাকে শুদ্ধ করে এবং শরীরকে করে পুনরুজ্জীবিত।


