শরীর নিয়ে হীনমন্যতা কেবল কৈশোরে নয়, বরং শৈশব থেকেই শুরু হয় এবং এর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা থাকে পরিবারের কাছের মানুষগুলোর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কারো শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করাই হলো বডি শেমিং। এটি সরাসরি অপমান বা সূক্ষ্ম রসিকতা—যেকোনো রূপেই আসতে পারে। গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনও পরোক্ষভাবে এই প্রবণতাকে উসকে দেয়।
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের শিশু ও পারিবারিক মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, শিশুরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ও শারীরিক বিকাশের পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যায়। এই সময়ে শরীর নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং তাদের সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
বডি শেমিংয়ের অন্যতম ভয়াবহ পরিণতি হলো ইটিং ডিজঅর্ডার বা খাওয়ার অস্বাভাবিক অভ্যাস। লোকলজ্জার ভয়ে অনেক শিশু লুকিয়ে অতিরিক্ত খাবার খায়, আবার কেউ কেউ ওজন কমাতে খাওয়ার পর জোর করে বমি করার মতো আত্মঘাতী পথ বেছে নেয়।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ছোটবেলার সামান্য বিদ্রূপও তাদের মনে আজীবন স্থায়ী ট্রমা হিসেবে থেকে যায়। যেমন ১৯ বছর বয়সী শুভ জানান, শিক্ষকের একটি তুচ্ছ মন্তব্য তাকে তার প্রিয় খেলা ক্রিকেট ছাড়তে বাধ্য করেছিল।
এভাবে শিশুদের সুপ্ত প্রতিভা আর আনন্দগুলো হারিয়ে যায় কেবল অন্যদের নিষ্ঠুর মন্তব্যের কারণে।
অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, শরীর নিয়ে মন্তব্য করা কাউকে কখনোই অনুপ্রাণিত করে না, বরং তার আত্মমর্যাদাবোধ ধ্বংস করে দেয়। একে ‘মোটিভেশনাল নিষ্ঠুরতা’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবার আগে বাবা-মাকে এগিয়ে আসতে হবে। আত্মীয়দের বুলিং থেকে সন্তানকে রক্ষা করা প্রতিটি অভিভাবকের দায়িত্ব।
শিশুকে ‘ওজন কমাও’ বা ‘এটা নিয়ে ভেবো না’ না বলে তার অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে। স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকলে আলাদা করে নয়, বরং পুরো পরিবার মিলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
বডি শেমিং বন্ধ করতে হলে নীরব দর্শক হওয়া থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যদি পরিবারের কেউ বারবার এমন মন্তব্য করে, তবে সেখানে হস্তক্ষেপ করা জরুরি। শিশুদের মূল্য যেন ওজনের কাঁটায় নির্ধারিত না হয়, বরং তারা যেন সহজাত আনন্দ নিয়ে বড় হতে পারে, তা নিশ্চিত করাই বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। শব্দের মাধ্যমেই যদি এই মানসিক ক্ষতের সৃষ্টি হয়, তবে ভালোবাসা ও ইতিবাচক শব্দের মাধ্যমেই তার নিরাময় সম্ভব।


