হিটস্ট্রোক হচ্ছে গরম আবহাওয়ার মধ্যে এক ধরনের নীরব প্রাণঘাতী বিপদ। গ্রীষ্মকালে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে এর ঝুঁকি বেশি থাকে। কেননা, শিশুদের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিকশিত নয়। গরমের সময় প্রাণঘাতী এই সমস্যা থেকে কোমলমতি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয় সম্পর্কে চ্যানেল 24 অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রাজধানীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড–১৯ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. আইভি আক্তার।
হিটস্ট্রোক কী:
শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে তাপ বের করতে না পারলে হিটস্ট্রোক হয়। এ সময় শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর বেশি হয়ে যায়। হিটস্ট্রোকে মস্তিষ্ক, হার্ট ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সময়মত সঠিক চিকিৎসা না হলে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
প্রধান কারণ:
তীব্র গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া, দীর্ঘ সময় রোদে থাকা, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া, ভারী কাজ বা খেলাধুলা করা, বন্ধ বা গরম পরিবেশে থাকা এবং অসুস্থতাজনিত কারণে ডিহাইড্রেট হয়ে যাওয়ার ফলে হিটস্ট্রোক হয়ে থাকে।
শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে কেন:
শরীরে পানির পরিমাণ বেশি হলেও রিজার্ভ কম। শিশুদের কিডনির কার্যক্ষমতা অপরিপক্ব। পানি ধরে রাখার ক্ষমতা কম। ত্বকের মাধ্যমে পানি নিঃসরণ বেশি (insensible loss) হয়। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়, শ্বাসের সঙ্গে পানি বেশি বের হয়। শিশুদের জ্বর বা ডায়রিয়া হলে খুব দ্রুত ডিহাইড্রেশন হয়। আবার শিশুদের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অপরিপক্ব, তারা পানি ও তরল জাতীয় খাবার কম খায়। অতিরিক্ত খেলাধুলা ও চঞ্চলতা করে, ফলে শিশুদের মধ্যে হিটস্ট্রোক দ্রুত এবং বেশি মারাত্মক হয়।
হিটস্ট্রোকের লক্ষণ:
শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা এর বেশি হওয়া। গরম ও শুষ্ক ত্বক, মাথা ঘোরা ও দুর্বলতা। বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক আচরণ, দ্রুত হৃদস্পন্দন, খিঁচুনি বা অচেতনতা, শিশুর মধ্যে অস্থিরতা বা অনবরত কান্না করতে দেখা যাবে। শিশুর প্রস্রাব কমে যাবে এবং ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়ার (late sign) মতো লক্ষণও দেখা যেতে পারে।
তাৎক্ষণিক করণীয় (First Aid):
শিশু বা কেউ হিটস্ট্রোক করলে তাকে দ্রুত ঠান্ডা বা ছায়াযুক্ত স্থানে নিতে হবে। পরনের টাইট কাপড় খুলে দিতে হবে। শরীরে ঠান্ডা পানি বা ভেজা কাপড় দিতে হবে। হাতের কাছে ফ্যান বা এসি থাকলে ব্যবহার করতে হবে। ওআরএস বা তরল দিতে হবে। এই সময়ের মধ্যেই দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে শিরা পথে স্যালাইন দিতে হবে।
শিশুদের জন্য বিশেষ সতর্কতা:
সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদে যেতে দেয়া যাবে না। এই সময় রোদে যেতে হলে ছাতা ব্যবহার করুন। হালকা ও সুতি কাপড় পরানো হলে গরম কিছুটা কম অনুভব হবে। খাদ্যতালিকায় হালকা সহজপাচ্য খাবার রাখতে হবে এবং ভাজাপোড়া যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।
শিশুর শারীরিক ওজন অনুযায়ী দৈনিক পানি পান নিশ্চিত করতে হবে। ১ থেকে ১০ কেজি ওজন হলে ১০০০ মিলি, ১১ থেকে ২০ কেজি ওজন হলে ১৫০০ মিলি, ২০ কেজির বেশি ওজন হলে ১৭০০ মিলি পরিমাণ পানি পান নিশ্চিত করতে হবে। শিশুকে কিছুক্ষণ পর পর অল্প করে পানি পান করানোর অভ্যাস করতে হবে। বিশেষ করে খেলাধুলার সময় প্রতি ২০-৩০ মিনিট পর পর পানি পান করাবেন। ওআরএস বা ডাবের পানি, ফলের রস বা রসালো ফল, রসালো সবজি যেমন- শশা, টমেটো, লাউ এসব খাদ্য দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে।
দৈনিক ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৫-৬ বার প্রস্রাব হয় কিনা, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। জ্বর বা ডায়রিয়ায় দ্রুত পানিস্বল্পতা পূরণ করা, গরমে অতিরিক্ত খেলাধুলা পরিহার করা, থাকার ঘরে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করা এবং শিশুদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে অভিভাবকদের।
সবশেষ শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আইভি আক্তার বলেন, হিটস্ট্রোক প্রতিরোধযোগ্য হলেও এটি দ্রুত প্রাণঘাতী হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা, পরিমাণমত পানি গ্রহণ এবং দ্রুত প্রাথমিক ব্যবস্থা—এই তিনটি বিষয়ই শিশু ও পরিবারের জীবন রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


