বিভাগের ৩৬টি সংসদীয় আসনের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেই নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ৩৩টি। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ৬৩টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বর্তমানে সক্রিয় ৫৯টির মাত্র ২৬টি দল খুলনা বিভাগে প্রার্থী দিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ৩৬টি আসনে এবার মোট প্রার্থী ২০৩ জন। এর মধ্যে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদ সীমিতসংখ্যক আসনে অংশ নিলেও অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলই রয়েছে নির্বাচনের বাইরে।
খুলনা আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ৩৬টি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ৩৫টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩১টি, জাতীয় পার্টি ২৫টি, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি ৭টি এবং গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) ৬টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ৫টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৪টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ৪টি এবং বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) ৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
এর বাইরে গণফোরাম, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ কংগ্রেস ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ২টি করে আসনে প্রার্থী দিয়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ রিপাবলিক পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিপি), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), প্রতিটি দলই মাত্র একটি করে আসনে প্রার্থী দিয়েছে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন ২৬ জন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নিবন্ধন থাকলেই রাজনৈতিক দল শক্তিশালী হয়ে ওঠে না। জনভিত্তি ও মাঠ পর্যায়ের সংগঠন ছাড়া নির্বাচনি অংশগ্রহণ অর্থবহ হয় না। তারা বলছেন, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি এবং নির্বাচন কমিশনের দল নিবন্ধন প্রক্রিয়া নতুন করে পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন।
নির্বাচন বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, অনেক নিবন্ধিত দলের বাস্তব রাজনৈতিক কার্যক্রম নেই। শুধু কাগজে কলমে দল থাকলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। নির্বাচন কমিশনের উচিত নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা। কিন্তু আমাদের দেশে এমন বহু দল রয়েছে, যাদের নাম আছে, নিবন্ধন আছে, কিন্তু কার্যক্রম নেই। এ দায় এড়াতে পারে না নির্বাচন কমিশন।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যখন দল নিবন্ধন দেয়, তখন শুধু কাগজপত্র দেখে নয়, দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব, নিয়মিত রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং জনগণের সঙ্গে সংযোগ আছে কি না এসব বিষয়ও যাচাই করা জরুরি। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক দল এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক ‘ওয়ান ম্যান শো’। নেতা আছেন, কিন্তু কর্মী নেই; কেন্দ্রীয় অফিস আছে, কিন্তু মাঠ নেই। রাজনৈতিক দল কখনোই ওয়ান ম্যান শো হতে পারে না।
কুদরত-ই-খুদা আরও বলেন, একটি রাজনৈতিক দলের প্রত্যেকটা অঞ্চলে সক্রিয় প্রতিনিধিত্ব থাকা দরকার। মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই জনভিত্তি তৈরি হয়। কিন্তু অধিকাংশ নিবন্ধিত দলের ক্ষেত্রে সেটি দেখা যাচ্ছে না। ফলে রাজনীতি ক্রমেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতির জন্য নির্বাচন কমিশনও দায় এড়াতে পারে না। কমিশনের উচিত দল নিবন্ধন প্রক্রিয়া নতুন করে পর্যালোচনা করা এবং কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করা। নিয়মিত অডিট, মাঠ পর্যায়ের যাচাই ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতেও এমন কাগুজে দল তৈরি হতে থাকবে।
তার ভাষায়, যে দল মানুষের কাছে যেতে পারে না, মানুষের কথা বলতে পারে না, তাদের দিয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়া সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশন যদি কঠোর না হয়, তাহলে নির্বাচন থাকবে, কিন্তু প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে না।
এদিকে ১৪ দলীয় জোটের শরিক সাম্যবাদী দল, ওয়ার্কার্স পার্টি ও ন্যাপসহ চার-পাঁচটি দল আগেই ঘোষণা দিয়েছে, তারা এবারের নির্বাচনে অংশ নেবে না। আর কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে না।


