বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬
বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬
26 C
Dhaka
Homeজেলার খবরফটিকছড়ির হালদা নদীর পাড়ে উদ্ভিদের মহাসমারোহঃ ২৩ প্রজাতি বিপন্ন ও শনাক্ত দূষণের...

ফটিকছড়ির হালদা নদীর পাড়ে উদ্ভিদের মহাসমারোহঃ ২৩ প্রজাতি বিপন্ন ও শনাক্ত দূষণের ২৯ উৎস

প্রকাশ: নভেম্বর ৫, ২০২৬ ৬:০৯
দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর দুই পাড়ে উদ্ভিদের বিপুল বৈচিত্র্য পাওয়া গেছে।গবেষকেরা সেখানে ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করেছেন।
এর মধ্যে ৫১৭ প্রজাতির উদ্ভিদ ঔষধি গুণসম্পন্ন। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২৩টি প্রজাতিকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণ উদ্যোগ না নিলে আরও ১০০টি প্রজাতি বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
একই গবেষণায় হালদা নদীর দূষণের ২৯টি উৎস শনাক্ত হয়েছে। নদীর দুই পাড়ের সমৃদ্ধ উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংরক্ষণে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন গবেষকেরা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চট্টগ্রামে বেসরকারি সামাজিক উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলসের (বিএসআরএম) সহযোগিতায় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
গবেষণায় নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক (রাসেল)। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন একই বিভাগের সাবেক সভাপতি ও মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দীন।
গবেষণায় শনাক্ত ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ ৫৮৭টি গণ ও ১৫২টি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে ৭৬৫টি স্থানীয় এবং ২৪৪টি বিদেশি প্রজাতি। বড় বৃক্ষ ২১২ প্রজাতির, গুল্ম ১৩৩টি, লতা ১৩৩টি, বীরুৎ ৫২২টি ও পরজীবী উদ্ভিদ ৯টি।
এ ছাড়া ২টি নগ্নবীজি, ১৩টি মসগোত্রীয়, ৩৫টি ফার্ন ও ৭ প্রজাতির ছত্রাকের সন্ধান পাওয়া গেছে। উদ্ভিদগুলোর মধ্যে একবীজপত্রী ২২৩টি এবং দ্বিবীজপত্রী ৭৪৯টি। ফ্যাবেসি ও পোয়াসি গোত্রের উদ্ভিদের আধিক্য দেখা গেছে।
গবেষকদের হিসাবে, শনাক্ত হওয়া উদ্ভিদের মধ্যে ৭২৯টি প্রজাতি হালদা নদী এলাকায় প্রথমবারের মতো নথিভুক্ত হয়েছে।
হালদা নদীর দুই পাড়ে শনাক্ত উদ্ভিদের মধ্যে ৫১৭ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ রয়েছে। এর মধ্যে কুর্চি, বচ, আপাং, কালমেঘ, হিজল, ছাতিম, আকন্দ, হাতিশুঁড়, সোনালু ও স্বর্ণলতা উল্লেখযোগ্য।
গবেষকদের মতে, এসব উদ্ভিদ ভবিষ্যতে ঔষধি উপাদান ও উদ্ভিদভিত্তিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
গবেষণায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২৩টি বিপন্ন উদ্ভিদ প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাটনা, লেইস্যা গর্জন, চাউ তাল, ঈশ্বরমূল, নেরা মিলাতি, পাখা ঢেকিয়া, বনিপদ, মাইল্লা আম, পানিজাম ও চালমুগড়া উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া সংরক্ষণ উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন আরও ১০০টি প্রজাতি চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা। তালিকায় রয়েছে নীলভুট্টা, তেজবহুল, ফাইজ গাছ, সিধা জারুল, কুর্চি পাম, খনা, অশোক, বরুন ও লবঙ্গ লতা।
গবেষণায় হালদা নদীর পরিবেশগত সংকটের চিত্রও উঠে এসেছে। নদীটির দূষণের জন্য ২৯টি উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পানিদূষণের ১৩টি, বায়ুদূষণের ১০টি, মাটিদূষণের ১১টি, শব্দদূষণের ৪টি, তাপীয় দূষণের ৪টি, ধূলিদূষণের ৫টি, ভারী ধাতু দূষণের ৬টি, প্লাস্টিক দূষণের ৩টি এবং ভূমিক্ষয়ের একটি উৎস রয়েছে।
একই উৎস থেকে একাধিক ধরনের দূষণ ঘটায় উৎসভিত্তিক সংখ্যাগুলোর যোগফল ২৯ ছাড়িয়েছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, নদীতীরবর্তী এলাকায় কৃষিকাজের বিস্তার ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার কারণে উদ্ভিদবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। নদীর কিছু এলাকায় কেওড়াগাছের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।
হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় ইকোর পক্ষ থেকে ১৩টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণ, নদীভাঙন রোধে দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো, নিয়মিত উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও পানির গুণমান পর্যবেক্ষণ এবং নদীতীরবর্তী কৃষকদের জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদে উৎসাহিত করা।
পাশাপাশি নদী দখল বন্ধ, শিল্পবর্জ্য শোধন, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, অপরিশোধিত নালা-ড্রেনের পানি নদীতে পড়া রোধ, নদী খননের মাটি নিরাপদ স্থানে অপসারণ এবং অপরিকল্পিত বসতি ও স্থাপনা নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গবেষণার প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক (রাসেল) বলেন, হালদা নদীকে সাধারণত মাছের প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এর দুই পাড়ের উদ্ভিদবৈচিত্র্য নিয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, হালদার পরিবেশ রক্ষায় শুধু মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ যথেষ্ট নয়। নদীর দুই পাড়ের উদ্ভিদ, জলজ প্রাণী, মাটি ও পানির সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এ জন্য নদী দখল ও দূষণ বন্ধের পাশাপাশি বিপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণ, দেশীয় প্রজাতির গাছ রোপণ, শিল্পবর্জ্য পরিশোধন এবং নিয়মিত পরিবেশ পর্যবেক্ষণ জরুরি।
গবেষণার তথ্য ভবিষ্যতে হালদা নদী সংরক্ষণ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় খবর