শনিবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৬
শনিবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৬
31 C
Dhaka
Homeধর্ম৩ টি কবিরা গুনাহ যা সাধারণ ক্ষমায় মাফ হয় না

৩ টি কবিরা গুনাহ যা সাধারণ ক্ষমায় মাফ হয় না

প্রকাশ: এপ্রিল ২৫, ২০২৬ ৪:১৯

গুনাহ শব্দটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত হলেও এটি মূলত একটি ফার্সি শব্দ। সাধারণভাবে যার অর্থ দ্বারায় পাপ বা অন্যায়। মহান রাব্বুল আলামিনের নির্দেশের পরিপন্থি সব কাজই গুনাহ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর গুনাহ বা পাপ মূলত ২ ধরনের হয়ে থাকে- ‘সগিরা’ বা ছোট গুনাহ এবং ‘কবিরা’ বা বড় গুনাহ।

সগিরা গুনাহ বিভিন্ন নেক আমলের মাধ্যমে মাফ হলেও উত্তমরূপে তওবা ছাড়া কবিরা গুনাহ মাফ হয় না। এমনকি কোনো কোনো কবিরা গুনাহের ক্ষেত্রে তওবা না করে মারা গেলে নিশ্চিত জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথাও হাদিসে এসেছে।

তাই পরকালে সফল হতে হলে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। সেই সঙ্গে মহান রবের হুকুম পালনের পাশাপাশি সর্বকালের সেরা আদর্শ প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আদর্শ ও সুন্নত অনুসরণ করে উত্তম আমল করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য একান্ত অপরিহার্য। কারণ, গুনাহ বা পাপ মানুষকে মহান রবের রহমত থেকে বঞ্চিত করে। সেই সঙ্গে এটি ধীরে ধীরে মানুষকে পাপাচারের দিকে ধাবিত করে। হাদিসে এসেছে, মানুষ তার পাপকাজের কারণে তার প্রাপ্য রিজিক থেকেও বঞ্চিত হয়। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৪০২২)

এ ক্ষেত্রে কবিরা গুনাহের মধ্যে কিছু গুনাহ বা পাপ রয়েছে যেগুলোর জন্য সাধারণভাবে মহান রবের কাছে ক্ষমা চাইলে সেগুলো মাফ হয় না। এর জন্য খাস নিয়তে উত্তমরূপে তওবা করা আবশ্যক। নিচে এমন ৩টি কবিরা গুনাহের কথা তুলে ধরা হলো।

শিরক

শিরকের চেয়ে বড় কবিরা গুনাহ নেই। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন- কবিরা গুনাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে শরিক (শিরক) করা, প্রাণ সংহার করা, পিতা-মাতার অবাধ্য-হওয়া আর মিথ্যা বলা অথবা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪০৫)

আল্লাহর সঙ্গে শিরককারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা অবশ্যই কুফরি করেছে যারা বলে, মারইয়াম পুত্র মাসীহই হচ্ছেন আল্লাহ। মাসীহ তো বলেছিল, হে বনি ইসরাঈল! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো যিনি আমার প্রতিপালক এবং তোমাদেরও প্রতিপালক। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীস্থাপন করে তার জন্য আল্লাহ অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন, আর তার আবাস হলো জাহান্নাম। জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।‘ (সুরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৭২)

অপর আয়াতে মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গে কাউকে শরিক করা ক্ষমা করবেন না। এটি ছাড়া অন্য সব পাপ ক্ষমা করেন যেগুলো তিনি চান। আর যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করলো, সে এক মহাঅপবাদ আরোপ করলো। (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮)

এছাড়াও জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন- আমি রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি- যে ব্যক্তি আল্লাহর সম্মুখে হাজির হবে এমন অবস্থায় যে, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তার সম্মুখে উপস্থিত হবে এমন অবস্থায় যে, সে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭২)

কারও হক নষ্ট করা

হক মূলত দুই প্রকার। একটি হলো আল্লাহর হক। অর্থাৎ, আল্লাহ যেসব আদেশ-নিষেধ করেছেন সেগুলো পালন করা। যেমন- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রোজা রাখা ইত্যাদি। আর দ্বিতীয়টি হলো বান্দার হক, যেমন- ইসলামে প্রতিবেশীর হক আদায়ের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, আল্লাহর হক আদায় না করলে মহান রাব্বুল আলামিন চাইলেই ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু বান্দার হক নষ্ট করলে, যার হক নষ্ট করা হয়েছে ওই ব্যক্তি ক্ষমা না করা পর্যন্ত আল্লাহ ক্ষমা করবেন না।

এ কারণে ইসলামে বান্দার হক নষ্ট করার বিষয়ে কঠোর নিষেধ রয়েছে। এর জন্য পরকালেও আছে ভয়ংকর শাস্তি। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- যে ব্যক্তি কসমের (মিথ্যা কসম) মাধ্যমে কোনো মুসলিমের হক বিনষ্ট করে তার জন্য আল্লাহ জাহান্নাম অবধারিত করে রেখেছেন এবং জান্নাত হারাম করে রেখেছেন। এ সময় জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসুল! অতি সামান্য বস্তু হলেও? জবাবে রাসুল (সা.) বলেন, আরাক গাছের (বাবলা গাছের মতো এক ধরনের কাঁটাযুক্ত গাছ) ডাল হলেও এ শাস্তি দেয়া হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫২)

এমনকি সম্পদ আত্মসাতের মাধ্যমেও কারও হক নষ্ট করা যাবে না। বিশেষ করে এতিমদের হকের বিষয়ে ইসলামে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই যারা ইয়াতিমদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তো তাদের পেটে আগুন খাচ্ছে। আর অচিরেই তারা প্রজ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে। (সুরা নিসা, আয়াত: ১০)

অপর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা অন্যায়ভাবে পরস্পরের সম্পদ গ্রাস করো না এবং জানা সত্ত্বেও অসৎ উপায়ে কারও সম্পদ গ্রাস করার উদ্দেশে তা বিচারকের কাছে নিয়ে যেও না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)

এ বিষয়ে আদী ইবনু উমাইরাহ্ আল-কিন্দী (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন- আমি রাসুল (সা.) কে বলতে শুনেছি- আমরা তোমাদের মধ্যে যাকে আদায়কারী নিযুক্ত করি, আর সে যদি একটি সূচ পরিমাণ বা তার চাইতেও কম সম্পদ আমাদের কাছে গোপন করে, তাই আত্মসাৎ বলে গণ্য হবে এবং তা নিয়েই কিয়ামতের দিন সে উপস্থিত হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৬৩৭)

প্রকাশ্যে গুনাহ বা পাপ করা

পবিত্র কুরআনে প্রকাশ্যে ও গোপনে- উভয় প্রকার পাপ বা গুনাহ থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ ত্যাগ কর। নিশ্চয়ই যারা পাপ অর্জন করে, তাদের অচিরেই প্রতিদান দেয়া হবে, তারা যা অর্জন করে তার বিনিময়ে। (সুরা আন’আম, আয়াত: ১২০)

আরেক আয়াতে মহান রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, ‘বল, আমার রব তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজ- যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে, আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সঙ্গে তোমাদের শরিক করা, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর উপরে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না’। (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩৩)

অন্যদিকে পরকালে প্রকাশ্যে পাপ বা গুনাহকারীর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, আমার সব উম্মত মাফ পাবে, তবে প্রকাশকারী ব্যতীত। আর নিশ্চয়ই এ বড়ই ধৃষ্টতা যে, কোনো ব্যক্তি রাতে অপরাধ করল যা আল্লাহ গোপন রাখলেন, কিন্তু সে ভোর হলে বলে বেড়াতে লাগল, হে অমুক! আমি আজ রাতে এমন এমন কর্ম করেছি। অথচ, সে এমন অবস্থায় রাত অতিবাহিত করল যে, আল্লাহ তার কর্ম গোপন রেখেছিলেন, আর সে ভোরে উঠে তার উপর আল্লাহর পর্দা খুলে ফেলল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৪৩)

তবে মনে রাখতে হবে, মহান রাব্বুল আলামিন পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু। যার ফলে তিনি বান্দার অনেক গুনাহ বা পাপই ক্ষমা করে দেন। পবিত্র কুরআনে খোদ মহান আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আর তোমাদের প্রতি যে মুসিবত (বিপদ) আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা আশ-শুরা, আয়াত: ৩০)

তাই সর্বাবস্থায় মুমিনের উচিত মহান রবের রহমত প্রত্যাশা করা। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজদের ওপর বাড়াবাড়ি (জুলুম) করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমা, আয়াত: ৫৩)

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় খবর