সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অফিসের চেয়ারে বসে কাজ। দিনের শেষে ঘাড়ে ব্যথা, পিঠে অস্বস্তি কিংবা কবজিতে যন্ত্রণা—অনেক চাকরিজীবীর কাছেই এসব পরিচিত সমস্যা। কর্মক্ষেত্র যতই আরামদায়ক হোক, দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে থাকা এবং একটানা কাজ করার অভ্যাস ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন জোড়া ও পেশিতে চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, একই ধরনের কাজ বারবার করা এবং কর্মক্ষেত্রে বসার ব্যবস্থা সঠিক না হওয়ায় শরীরে অস্বস্তি ও ব্যথা বাড়তে পারে। তবে ডেস্কে বসে কাজ করলেই আর্থ্রাইটিস হবে, এমন নয়।
ভারতের কে জে সোমাইয়া কলেজ অব ফিজিওথেরাপির মাসকিউলোস্কেলেটাল ফিজিওথেরাপি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রধান ডা. রূপালি শেভালকারের মতে, শরীরের জোড়া সুস্থ রাখতে নিয়মিত নড়াচড়া গুরুত্বপূর্ণ।
শরীরের জোড়াগুলো সুস্থ রাখতে নড়াচড়া প্রয়োজন। শরীর সচল থাকলে জোড়ার তরল কার্টিলেজে পুষ্টি পৌঁছাতে সাহায্য করে এবং তা মসৃণ রাখতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে পেশিগুলো সক্রিয় থাকে এবং মেরুদণ্ডকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেয়।
কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা বসে থাকলে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। নিতম্বের পেশি ও আশপাশের অংশ শক্ত হয়ে যেতে পারে, কিছু পেশির সক্রিয়তা কমে যেতে পারে। তখন শরীর সোজা রাখতে ঘাড় ও পিঠের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এ কারণে আরামদায়ক চেয়ারে বসেও দীর্ঘ সময় পর ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
কম্পিউটারে টাইপ করা, মাউসে ক্লিক করা কিংবা স্ক্রল করার মতো কাজগুলো আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও প্রতিদিন হাজার হাজার বার একই নড়াচড়া করলে শরীরে চাপ তৈরি হতে পারে।
কবজি বাঁকিয়ে কাজ করা এবং হাতের নিচে যথাযথ সমর্থন না থাকলে টেনডন ও স্নায়ুতে জ্বালা বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এর ফলে কবজি ও বুড়ো আঙুলে ব্যথা, হাতের নিচের অংশে টান কিংবা আঙুলে ঝিনঝিন অনুভূতি হতে পারে। মাউস শরীর থেকে বেশি দূরে রাখলে কাঁধেও বাড়তি চাপ পড়ে।
দীর্ঘ সময় কাজ করলে বিরতি নেওয়ার সুযোগ কমে যায় এবং একই ভঙ্গিতে বসে থাকতে হয়। মানসিক চাপের সময় অনেকেই অজান্তে কাঁধ উঁচু করে রাখেন কিংবা চোয়াল শক্ত করে ফেলেন।
এর সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা যুক্ত হলে শরীরের বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ আরও কমে যায়। ফলে যে সামান্য ব্যথা বিশ্রামে কমে যাওয়ার কথা, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
কম্পিউটারের পর্দা খুব নিচুতে থাকলে বারবার মাথা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে কাজ করতে হয়। এতে ঘাড়ে বাড়তি চাপ পড়ে। একইভাবে, কোমরের নিচের অংশে যথাযথ সমর্থন নেই, এমন চেয়ারে দীর্ঘ সময় বসে থাকাও অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
কাজের সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন—
- কম্পিউটারের পর্দার ওপরের অংশ চোখের সমতলে রাখুন।
- পর্দা চোখ থেকে প্রায় এক হাত দূরত্বে রাখুন।
- কনুই প্রায় ৯০ ডিগ্রি কোণে রাখুন।
- পা মেঝেতে সমতলভাবে রাখুন এবং পিঠে যথাযথ সমর্থন নিশ্চিত করুন।
- কিবোর্ড ও মাউস এমন জায়গায় রাখুন, যাতে কাঁধ ও কবজিতে বাড়তি চাপ না পড়ে।
- হাঁটু নিতম্বের তুলনায় বেশি উঁচু হয়ে থাকলে বসার অবস্থান ঠিক করুন।
- ল্যাপটপে দীর্ঘ সময় কাজ করলে স্ট্যান্ডের সঙ্গে আলাদা কিবোর্ড ও মাউস ব্যবহার করা যেতে পারে।
- জোড়ার ওপর চাপ কমাতে দৈনন্দিন অভ্যাসে সামান্য পরিবর্তনই সহায়ক হতে পারে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পরপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ানো, শরীর টানটান করে স্ট্রেচিং করা কিংবা কিছুক্ষণ হাঁটা ভালো অভ্যাস।
এ ছাড়া প্রতি ২০ মিনিট পর কাঁধ ঘোরানো এবং ঘাড় ও কবজি প্রসারিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফোনে কথা বলার সময় বসে থাকার পরিবর্তে দাঁড়িয়ে কথা বললেও দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে থাকার অভ্যাস ভাঙতে সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা এবং পিঠ, পেটের মূল পেশি, নিতম্ব ও কাঁধ শক্তিশালী করার সাধারণ ব্যায়ামও উপকারী হতে পারে। সপ্তাহের শেষে একবার বেশি ব্যায়াম করার চেয়ে নিয়মিত শরীর সচল রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে বারবার একই ধরনের কাজ করার মাঝখানে ছোট বিরতি নেওয়া, হাতের আঙুল নাড়ানো এবং বসার ভঙ্গি পরিবর্তন করা উচিত। লক্ষ্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিখুঁত ভঙ্গিতে বসে থাকা নয়; বরং দীর্ঘ সময় একই অবস্থানে থাকা এড়িয়ে চলা।
দীর্ঘ সময় কাজের পর সামান্য শক্তভাব বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। তবে ব্যথা নিয়মিত হলে, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটালে কিংবা হাত-পায়ে ঝিনঝিন অনুভূতি হলে অবহেলা করা উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ব্যথার সঙ্গে অসাড়তা বা দুর্বলতা দেখা দিলে, কিংবা অস্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে দ্রুত চিকিৎসকের মাধ্যমে মূল্যায়ন করানো উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপিস্ট উপযুক্ত ব্যায়াম, যত্ন এবং কর্মক্ষেত্রের বসার ব্যবস্থা পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পারেন।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


