ক্ষুধা নেই, পরে খাব’, পরীক্ষার সময় অনেক শিক্ষার্থী প্রায়ই এমনটা বলেন। দীর্ঘ অধ্যয়ন, নোট মুখস্থ এবং সময় সীমিত হওয়ার কারণে অধিকাংশ সময় খাদ্যকে অবহেলা করা হয়। তবে এমনটা করলে সেটি হবে ভুল সিদ্ধান্ত। খাদ্য কীভাবে আপনার ভালো গ্রেডের কারণ হতে পারে এবং কেন পড়াশোনার সময় খাদ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া ঠিক নয়―এসব ব্যাপারে লিখেছেন রাজধানীর প্র্রাইমএশিয়া ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিজ্ঞান শিক্ষার্থী জান্নাত প্রেমা।
➤ পরীক্ষার সময় স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া জরুরি:
পরীক্ষার সময় হলে টানা পড়াশোনা, দীর্ঘ লাইব্রেরি সেশন আর নোটের পর নোটে ডুবে থাকা এক ক্লান্তিকর বাস্তবতা। সেমিস্টারের এই সময়টায় শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে মানসিক চাপ তৈরি হয়। ভালো ফলাফলের আশায় যেখানে সময় ব্যবস্থাপনা ও নিরষ্কুশ পরিশ্রমকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়, সেখানে খাদ্যাভ্যাস প্রায়ই গুরুত্ব হারায়। অথচ গবেষণা ও পুষ্টিবিজ্ঞানের আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের ফলাফলে স্বাস্থ্যকর খাবারের ভূমিকা উপেক্ষা করার মতো নয়।
একাডেমিক সাফল্যর সঙ্গে ডায়েটের সম্পর্ক শুধুই শক্তি যোগানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সরাসরি মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক স্থিতির সঙ্গেও সংযুক্ত। যেকোনো পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় সকালের নাশতা বাদ দেয়া ও দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা শুধুই চা-কফির ওপর নির্ভর হওয়া এটি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এ জন্য পরীক্ষার পড়া বারবার রিভিশনের পাশাপাশি সময়মত পরিমিত খাবার ও ফলমূল খাওয়ার মতো অভ্যাসগুলো একজন শিক্ষার্থীর জন্য খুবই প্রয়োজন।
➤ মস্তিষ্কের জন্য কার্যকর খাবার:
পুষ্টিবিজ্ঞানের বহুল ব্যবহৃত পাঠ্যবই Understanding Nutrition (Whitney & Rolfes) এবং Advanced Nutrition and Human Metabolism (Gropper et al.) অনুযায়ী, মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় কার্যকারিতা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট কিছু পুষ্টি উপাদান অপরিহার্য। সঠিক খাদ্য নির্বাচন নিউরনের কার্যক্রমকে সহায়তা করে, নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে, যা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
- মাছ: মস্তিষ্কের গঠনগত দিক থেকে প্রায় ৬০ শতাংশই চর্বি, যার একটি বড় অংশ ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। সামুদ্রিক মাছ এই ওমেগা–৩-এর অন্যতম প্রাকৃতিক উৎস। পুষ্টিবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, ওমেগা–৩ নিউরনের কোষঝিল্লির নমনীয়তা বজায় রাখে এবং স্নায়বিক সংকেত আদান-প্রদানকে কার্যকর করে তোলে। পাশাপাশি মাছের মধ্যে থাকা সেলেনিয়াম নামক ট্রেস মিনারেল দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানীয় অবক্ষয় প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। সেলেনিয়ামের ঘাটতি মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সঙ্গে সম্পর্কিত এমন তথ্য একাধিক নিউট্রিশনাল স্টাডিতে উল্লেখ রয়েছে।
- ডিম: পরীক্ষার সময় খাদ্যতালিকায় ডিমকে আলাদা করে উল্লেখ না করলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ডিম উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি কোলিনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উৎস। কোলিন থেকে মস্তিষ্কে অ্যাসিটাইলকোলিন নামক নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি হয়, যা শেখা, তথ্য ধরে রাখা এবং স্মৃতি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায়, কোলিন স্নায়বিক যোগাযোগকে শক্তিশালী করে, যা দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনার সময় মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
- সবুজ শাক-সবজি: পালং শাক, বাঁধাকপি, ব্রাসেলস স্প্রাউট এবং মটরশুঁটির মতো সবুজ শাক-সবজিতে থাকা ফোলেট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট। ফোলেট ডিএনএ সংশ্লেষ ও নিউরনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফোলেট প্রদাহজনিত কণিকা হ্রাস করতে পারে, যা জ্ঞানীয় হ্রাসের অন্যতম কারণ। নিয়মিত সবুজ শাক-সবজি গ্রহণ স্মৃতিশক্তিকে সহায়তা করে এবং মানসিক ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে।
- ব্রকলি: ক্রুসিফেরাস সবজি হিসেবে ব্রকলি পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এতে থাকা ভিটামিন সি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং ভিটামিন কে মস্তিষ্কের কোষে থাকা উপকারী ফ্যাটের বিপাক নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। পুষ্টিবিজ্ঞানের গবেষণায় ভিটামিন কে-কে নিউরনের টিকে থাকার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্রকলির অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান মস্তিষ্ককে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে সুরক্ষা দেয়, যা পরীক্ষার সময় অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
- ব্লুবেরি: ব্লুবেরি পলিফেনল ও ফ্ল্যাভনয়েডে সমৃদ্ধ একটি ফল, যা মস্তিষ্কের জন্য বিশেষভাবে উপকারী। এই উদ্ভিদজাত যৌগগুলো নিউরনের ক্ষয় রোধ করে এবং স্নায়বিক যোগাযোগ উন্নত করে। পুষ্টিবিজ্ঞানের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্লুবেরি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মানসিক কর্মক্ষমতা ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণেও এর ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
- বাদাম ও বীজ: আখরোট, বাদাম, চিয়া ও ফ্ল্যাক্সসিড ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ভিটামিন ই-এর ভালো উৎস। ভিটামিন ই একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা নিউরনকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। পুষ্টিবিজ্ঞানের আলোচনায় দেখা যায়, ভিটামিন ই সমৃদ্ধ খাদ্য ভালো কগনিটিভ পারফরম্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত। পরীক্ষার সময় অল্প পরিমাণে বাদাম ও বীজ মানসিক সতর্কতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
- ডার্ক চকলেট: ন্যূনতম চিনি দিয়ে তৈরি ডার্ক চকলেট পরীক্ষার আগে একটি কার্যকর ‘ব্রেইন বুস্টার’ হিসেবে কাজ করতে পারে। কোকোয়াতে থাকা ফ্ল্যাভনয়েড মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়ায়, ফলে মনোযোগ ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের গতি সাময়িকভাবে উন্নত হয়। পাশাপাশি এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে।
- ক্যাফিন: চা ও কফিতে থাকা ক্যাফিন কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে সতর্কতা বাড়ায় এবং ক্লান্তি কমায়। তবে পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অতিরিক্ত ক্যাফিন উদ্বেগ, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় পরিমিত ক্যাফিন গ্রহণই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।
- হলুদ: হলুদের সক্রিয় উপাদান কারকিউমিন প্রদাহবিরোধী গুণে সমৃদ্ধ এবং এটি রক্ত–মস্তিষ্ক বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম। নিউট্রিশনাল নিউরোসায়েন্সে কারকিউমিনকে মস্তিষ্কের কোষ সুরক্ষায় সম্ভাবনাময় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি নিউরোইনফ্ল্যামেশন কমাতে সহায়তা করে।
- পানি: মস্তিষ্কের প্রায় ৭৫ শতাংশই পানি দিয়ে গঠিত। তাই হাইড্রেশন ছাড়া জ্ঞানীয় কার্যকারিতা কল্পনাই করা যায় না। সামান্য পানিশূন্যতাও মনোযোগ, স্মৃতি ও মানসিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় পর্যাপ্ত পানি ও প্রাকৃতিক তরল গ্রহণ একটি মৌলিক কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।
➤ অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট নিয়ে সতর্কতা:
পরীক্ষার আগে অতিরিক্ত পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট যেমন পাউরুটি, পাস্তা বা অতিরিক্ত ভাত তাৎক্ষণিক শক্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে মনোযোগ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। পুষ্টিবিজ্ঞানের মতে, এগুলো রক্তে গ্লুকোজের দ্রুত ওঠানামা ঘটিয়ে ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা বাড়াতে পারে। বরং প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাটসমৃদ্ধ খাদ্য মস্তিষ্কের জন্য অধিক কার্যকর।
➤ সময় স্বল্পতা ও কম বাজেটের মধ্যে স্বাস্থ্যকরভাবে পুষ্টি নিশ্চিত করন:
অনেক শিক্ষার্থী মনে করে থাকে, স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই খরচ ও সময় বেশি। বাস্তবে বিষয়টি অনেকাংশে ভুল। বেশি দামে পুষ্টিকর খাবার থাকলেও কম খরচায় অনেক দেশীয় ও সিজনাল খাবার দিয়েই প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা যায়।
- স্যান্ডউইচ: ডিম বা সবজি দিয়ে তৈরি সাধারণ স্যান্ডউইচ দ্রুত তৈরি করা যায় এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির ব্যস্ত সময়ে একটি ব্যালান্সড মিল হিসেবে কাজ করে এটি।
- ব্রকলি স্যুপ: সহজে হজম হয়, শরীর হালকা রাখে এবং ব্রকলির অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন মস্তিষ্কের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে রাতে পড়ার সময়।
- মৌসুমি ফল: যেমন কলা, পেঁপে, জাম। এসব ফলে থাকা প্রাকৃতিক শর্করা দ্রুত শক্তি জোগায়।
- মৌসুমি শাক-সবজি: প্রচুর পরিমাণে এন্টি-অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন পাওয়া যায় মৌসুমি শাক-সবজিতে।
- ডিম ও সয়াবিন: যা সহজলভ্য ও কম খরচে পাওয়া প্রোটিনের নির্ভরযোগ্য উৎস। ডিমে থাকা কোলিন এবং সয়াবিনের অ্যামিনো অ্যাসিড মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার কার্যক্রমে সহায়তা করে, যা স্মৃতি ও মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে।
- ছোট মাছ (মলা, পুঁটি, কাচকি): সপ্তাহে ২–৩ বার খেলে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়, যা স্নায়ু কোষ এবং স্মৃতিশক্তির জন্য খুব ভালো কাজ করে।
- বাদাম ও বীজ: আখরোট, কাঠবাদাম, কুমড়া বীজ, খেজুর নিয়মিত খেলে শরীরে জিঙ্ক ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট (HDL) বাড়ে। যা মনোযোগ বাড়ায়।
- পানি: শরীরের কোষের অক্সিজেন ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার জন্য পরিমিত পানি পান করা অপরিহার্য।
সবশেষ পরামর্শ, পড়ালেখায় মনোযোগ বাড়াতে শুধু পড়ার চাপ নয়, শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টির দিকেও বিশেষ নজর রাখতে হবে। আর যেকোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতে হবে।


