বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
26 C
Dhaka
Homeজীবনযাপনকলার মোচা ও থোড়ের চাহিদা বাড়ছে দিনের পর দিন

কলার মোচা ও থোড়ের চাহিদা বাড়ছে দিনের পর দিন

প্রকাশ: অক্টোবর ৮, ২০২৬ ৪:০৯

একসময় গরিব মানুষের পরিচিত খাবার ছিল কলার মোচা ও থোড়। আধুনিক যুগে ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ভিড়ে আড়ালে চলে যায় পুষ্টিকর এই খাবার। অনেকে এগুলো ফেলেও দিতেন। তবে আবারও সবজির বাজারে জায়গা করে নিচ্ছে কলার মোচা ও থোড়।

কলার মোচা ও থোড় শৌখিন ও স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মাঝে জায়গা করে নিচ্ছে এই খাবার।

দিনাজপুরের বিভিন্ন বাজারে কলার মোচা ও থোড় নিয়মিতভাবে বিক্রি হচ্ছে। দামও অনেকটা নাগালের মধ্যে। ২০-৪০ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি হচ্ছে সবজি দুটি।

দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজার, চকবাজার, রেলবাজার, চৌরঙ্গী বাজার, নিউটাউন বাজার, পুলহাট, রুপম মোড়, হাউজিং মোড়সহ জেলার ৬৪টি হাট ও বিভিন্ন মোড়ে কলার মোচা ও থোড় বিক্রি করতে দেখা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলার এক হাজার ২৫৯ হেক্টর জমিতে কলা চলা চাষ হয়। তাই কলার মোচা ও থোড় পেতে খুব একটা কষ্ট করতে হয় না। এখন জেলার সর্বত্র এই মোচা ও থোড় পওয়া যায়।

  • উপকারিতা

কলার মোচা ও থোড়ের তরকারি অ্যানিমিয়া বা রক্ত স্বল্পতা দূর করে, প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে, যা রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে রয়েছে উচ্চমাত্রার ফাইবার বা আঁশ, যা রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যেতে দেয় না। ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি একটি আদর্শ সবজি।

মোচার ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং পরিপাকতন্ত্রকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। কলার থোড়ের রস কিডনির পাথর প্রতিরোধে এবং লিভার সুস্থ রাখতেও ভূমিকা রাখে। ক্যালোরির পরিমাণ খুবই কম কিন্তু পেট অনেকক্ষণ ভরিয়ে রাখে এই খাবার, যা ওজন কমানোর জন্য সহায়ক। এতে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হৃদযন্ত্র ভালো রাখে।

  • মোচা আর থোড় কিন্তু এক নয়

অনেকেই এই দুটি সবজিকে গুলিয়ে ফেলেন। দুটি সবজিই কলাগাছের সম্পূর্ণ ভিন্ন অংশ। মোচা হলো কলাগাছের ফুল। কলার ছড়া বের হওয়ার আগে বা পরে যে গাঢ় লাল-বেগুনি রঙের অংশটি ঝুলে থাকে, সেটাই মোচা। আর কলার থোড় হলো কলাগাছের ভেতরের নরম সাদা মজ্জা বা কাণ্ড। কলাগাছ কেটে ফেলার পর তার ভেতরের আঁশযুক্ত অংশটি বের করে খাওয়া হয়।

  • জনপ্রিয় কিছু ঐতিহ্যবাহী পদ

বাঙালির রান্নাঘরে মোচা ও থোড় দিয়ে চমৎকার সব মুখরোচক পদ তৈরি করা হয়। যার মধ্যে কলার মোচার ঘণ্ট জনপ্রিয় খাবার। এটি চিংড়ি মাছ, ডালনা বা গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে তৈরি অন্যতম সেরা একটি বাঙালি পদ। বিকেলের নাশতার জন্য মোচা সেদ্ধ করে বেশন দিয়ে মশলা মিশিয়ে চমৎকার চপ বা কাটলেট তৈরি করা যায়।

কালোজিরা, কাঁচামরিচ ও নারিকেল কোড়া, চিংড়ি মাছের শুঁটকি দিয়ে থোড় ভাজি অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার। অনেকে ডাল ও ডিম দিয়েও রান্না করে থাকেন। কেউ আবার খালি পেটে থোড়ের রস জুস হিসেবে পান করেন।

দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজারে মোচা ও থোড় বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছেন এজামুল হক। তিনি বলেন, ‘দিনাজপুরের সব উপজেলায় ব্যাপক হারে কলা চাষ হয়। আগে বাগানগুলোতে গিয়ে বিনা পয়সায় নিয়ে এসে বিক্রি করতাম। থোড় গাছ কেটে বের করা কঠিন হওয়ায় এখন ফ্রি পাওয়া যায়। তবে মোচা ৩-৫ টাকা পিস হিসেবে কিনে নিতে হয়। সময়ভেদে বাজারে সেই মোচা ১০-৪০ টাকায় বিক্রি করছি আমরা। সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয় বিচি কলার (আঠিয়া কলা) মোচা। তবে এটা বাণিজ্যিকভাবে চাষ না হওয়ায় কম পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন ৩০০-৪০০ পিস পর্যন্ত মোচা বিক্রি হয়। এক হাত লম্বা থোড় বিক্রি হয় ১০ থেকে ১৫ টাকায়। কোনো কোনো সময় ২০ টাকায়ও বিক্রি হয়।’

আরেক বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘তিনি যখন দুই বছর আগে প্রথম দিকে মোচা ও থোড় নিয়ে বাজারে আসতেন, তখন অনেক লজ্জায় কিনতে চাইতেন না। বিশেষ করে থোড় কেনার আগে ডানে বামে তাকাতেন কেউ দেখছেন কি-না। আর এখন তারাই আমাদেরকে খুঁজে বের করেন। আগামীকাল কখন আসব জিজ্ঞাসা করেন।’

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের স্টাফ আনোয়ার সাদাত মানিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘আয়রন ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ও পেট পরিষ্কার রাখায় আমি নিয়ম করে থোড় কিনে খাই। বাসাতেও খুব পছন্দ করে। চিংড়ি মাছ, ডিম, শুঁটকি ও ডাল দিয়ে রান্না করে খাই। মোচা ও আলু সিদ্ধ তরে রান্না করে খেতেও দারুণ স্বাদ।’

নিয়মিত থোড় ও মোচা কিনে খান মো. আলম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা শুঁটকি-ডাল দিয়ে থোড় রান্না করে খাই। মোচা ডিম দিয়ে রান্না করে খাই। আগে মানুষ কিনে খেতে চাইতো না। এখন অনেকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করছে।’

রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন লিমন হোসেন। তিনি বলেন, শরীরে আয়রনের ঘাটতি পূরণ ও রক্ত বাড়াতে মোচা ও থোড় নিয়মিত খাই।

কাহারোল উপজেলার একজন সবজি ব্যবসায়ী মো. আলী। তিনি বিভিন্ন ধরনের সবজি ঢাকায় পাঠান। ইদানীং মোচা ও থোড়ও পাঠাচ্ছেন। জানালেন, ঢাকায় এই দুই সবজির বেশ চাহিদা রয়েছে।

সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা এলাকার কৃষক জুয়েল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে আমরা মোচা ফেলে দিতাম, থোড় পচে যেত। এখন মোচা কেনার জন্য অনেকেই আসেন। ৩-৫ টাকা পিস কিনে নিয়ে যান। দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। সামনের দিনগুলোতে মোচা ও থোড়ের চাহিদা বাড়বে।’

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডিসি রায় জাগো নিউজকে বলেন, ‘মোচা-থোড় দুটিই নির্ভেজাল সবজি। এগুলো আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখতে দারুণ সাহায্য করে। থোড় ধীরে হজম হওয়ায় অনেক সময় না খেয়ে থাকা যায়। এটি পুষ্টিগুণ ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার। এ খাবারে কোনো কীটনাশক নেই। ধীরে ধীরে এই খাবারের চাহিদা বাড়ছে।’

সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা মোসোদ্দেক হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দিনাজপুরে ব্যাপক হারে কলার চাষ হয়। ফলে মোচা ও থোড়ের অভাব নেই। এই খাদ্যকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারলে নষ্ট হয়ে যাওয়া এই মোচা ও থোড় থেকে মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটাতে সহায়ক হতে পারে।’

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিছুজ্জামান বলেন, ‘আগে চাষের কলার মোচা ও থোড় মানুষ খেতে চাইতো না। এখন বাজারে মোচা ও থোড় নিয়মিত বিক্রি হয়। ফেরি করে যারা সবজি বিক্রি করেন, তারাও মোচা ও থোড় বিক্রি করেন। মানুষের খাদ্যাভাসে পরিণত করা গেলে মোচা ও থোড় খাদ্য ঘাটতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।’

আরও পড়ুন
spot_img

জনপ্রিয় খবর